আজকাল অনেককেই বলতে শোনা যায়—আরে ভাই, ব্যায়াম করব কি? এমনিতেই দুবেলা পেট ভরে খেতে পাই না। তার উপর যদি ব্যায়াম করি, শরীরের ক্ষয় পূরণ হবে না। ফলে কঠিন রোগে মারাই যাবো।

এটা ব্যায়াম না করার একটা বাজে অজুহাত ছাড়া কিছু নয়। সাধারণ মধ্যবিত্ত মানুষ যে রকম ডাল, ভাত, মাছ, শাক, তরিতরকারী খেয়ে জীবন ধারণ করে, যোগ ব্যায়ামকারীর পক্ষে তাই যথেষ্ট।


শরীরটাকে সুস্থ, সবল ও কর্মঠ রাখার জন্য যে সব ব্যায়াম দরকার, তাতে ঘরের খাবারের চেয়ে বেশি বা অধিক পুষ্টিকর ও মূল্যবান খাবারের দরকার পরে না।



দেহের ক্ষয়পূরণ, বৃদ্ধিসাধন, কর্মশক্তি ও রোগ-প্রতিরোধশক্তি উৎপাদনের জন্যে খাদ্যের প্রয়োজন। ক্ষয়পূরণ ও বৃদ্ধিসাধনের জন্যে দরকার আমিষ জাতীয় খাদ্য, যেমন—দুধ, মাছ, মাংস, ডিম, ছানা, সোয়াবিন, চিনেবাদাম, ছোলা ও নানা রকমের ডাল।


এর মধ্যে প্রথম পাঁচটি প্রথম শ্রেণীর এবং অবশিষ্টগুলি দ্বিতীয় শ্রেণীর। উত্তাপ ও কর্মশক্তির জন্যে শর্করা ও স্নেহ জাতীয় খাদ্য দরকার, যেমন ভাত, আটা, ময়দা, চিনি, গুড়, আলু, তেল, ঘি, মাখন, চর্বি ইত্যাদি।


আর রোগ প্রতিরোধক শক্তির জন্যে দরকার খাদ্যপ্রাণ এবং সবুজ টাটকা শাক-সবজি। বেগুন ও নানা প্রকার ফলে আমরা প্রচুর খাদ্যপ্রাণ এবং শাক-সব্‌জিতে বিভিন্ন লবণ জাতীয় উপাদান পাই।




বিভিন্ন খাদ্যের এত পুষ্টিমূল্য থাকা সত্ত্বেও সঠিক পদ্ধতিতে রান্না না করার জন্য খাদ্যের খাদ্যপ্রাণ নষ্ট হয়ে যায়। তরিতরকারির খোসা ফেলে দিয়ে তরকারি কুটে জলে রগড়ে রগড়ে ধুয়ে এবং ঢাকনা না দিয়ে খাদ্যদ্রব্য রান্না করে আমরা খাদ্যপ্রাণ নষ্ট করি। 


এ ছাড়া খোসাসহ তরিতরকারি এবং শাকসবজি খেলে দাস্ত পরিষ্কার হয় এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দূর হয়। ভাতের ফ্যান ফেলে দিয়েও আমরা ভাতের আংশিক পুষ্টি নষ্ট করি। 


দুধকে পরিপূর্ণ খাদ্য বলে। খাদ্যের মধ্যে যে ছয়টি উপাদান আছে কেবল দুধের মধ্যে একাধারে  ও্ই ছয়টি উপাদান বর্তমান। এই জন্যে দুধ সকলেরই বিশেষ করে শিশুদের, গর্ভবতী মায়েদের ও স্তন্যদায়ী জননীর পক্ষে একান্ত প্রয়োজন। 


ব্যায়ামকারীদের মধ্যে যাদের সামর্থ্য আছে, তাদের উচিত—প্রতিদিন সামর্থ্য অনুযায়ী কিছু দুধ পান করা। কিন্তু খাঁটি দুধ পাওয়া আজকাল প্রায় অসম্ভব। বেশি দাম দিলেও পাওয়া যায় না। 


আজকাল শহরে কোন রকমে মাথা গুঁজে থাকার জায়গা নেই। এই অবস্থায় বাড়িতে গরু পুষে দুধ পান করার কল্পনা করা বাতুলতা মাত্র। তবে যাদের সুবিধা আছে, তাদের গরু পুষে হোক বা যে কোন উপায়েই হোক, প্রতিদিন অন্ততঃ এক পোয়া দুধ পান করা উচিত।


দুধে ট্রিপটোফেন জাতীয় এক প্রকার প্রোটিন থাকায় তন্দ্রা আনতে সাহায্য করে। রাত্রে শোবার আগে এক গ্লাস গরম দুধ পান করলে সহজেই ভাল ঘুম আসে।


দুধের পরেই ডিম আর একটি পরিপূর্ণ খাদ্য। এতে শ্বেতসার ছাড়া প্রচুর আমিষ ও স্নেহজাতীয় পদার্থ, খাদ্যপ্রাণ ও লৌহ জাতীয় নানা লবণ আছে। 


খাদ্য হিসাবে হাঁসের ডিম ও মুরগীর ডিমের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। তবে হাঁসের ডিমে একটু আঁশটানি গন্ধ থাকায় অনেকে এই ডিম পছন্দ করেন না। 


কিন্তু হাঁসের ডিম আকারে বড় হওয়ায় হাঁসের ডিমে মুরগীর ডিমের চেয়েও বেশি খাদ্যাংশ থাকে। অনেকের ধারণা হাঁসের ডিম খেলে বাত হয়; কিন্তু এর মূলে কোন বৈজ্ঞানিক যুক্তি নেই। 


ডিম যত বেশি সিদ্ধ বা ভাজা হয়, তত হজম হতে সময় লাগে। সিকি বা অর্ধসিদ্ধ ডিম পুষ্টিকর ও সহজপাচ্য।


এই বিষয়ে ডিম ও দুধের মধ্যে তুলনা করলে ডিম সহজে শীর্ষস্থান অধিকার করবে–দুধে সহজ়ে ভেজাল দেওয়া যায় কিন্তু ডিমে ভেজাল চলে না। 


গরম দুধে একটা কাঁচা হাঁসের ডিম ও তার সঙ্গে দু চামচ চিনি মিশিয়ে পান করা খুব পুষ্টিকর–গুরু ও কঠিন ব্যায়ামকারীর জন্যে বিশেষ ফলপ্রদ।






পুষ্টিমূল্যের দিক থেকে ছোলা, আপেল, পেয়ারা, কলা ও খেজুরের মধ্যে তুলনা করলে দেখা যাবে ছোলা, কলা, পেয়ারা ও খেজুর আপেলের চেয়ে বেশি পুষ্টিকর অথচ দামে সস্তা। ছোলা পুষ্টিকর ও শক্তিবর্ধক খাদ্য।





ছোট ছেলেমেয়েদের ছাড়া অন্য সকলের দৈনিক চার বার খাদ্য গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। দুবার পেটভরে খাওয়া আর দুবার রাস্তা। 

খাদ্য গ্রহণের পর সাধারণতঃ হজম হতে ৪/৫ ঘন্টা সময় লাগে। তাই প্রত্যেকবার খাদ্যগ্রহণের মাঝে প্রায় ৪/৫ ঘন্টা ব্যবধান রাখা হয়েছে যাতে প্রতিবারে খাবার সময় বেশ ক্ষুধার উদ্রেক হয়। 

যাদের সামর্থ্যে কুলাবে তারা সকালে ১টি অর্থসিদ্ধ ডিম, দুপুরে এক পোয়া দুধ এবং রাত্রে শোবার আগে এক পোয়া দুধ পান করলে দ্রুত শারীরিক উন্নতি হবে। 

দুপুরে ও রাত্রে পেটভরে খাবার পর মুখশুদ্ধি হিসাবে হরিতকির বা আমলকির টুকরা চর্বন করা স্বাস্থ্যকর।

এ ছাড়া রোজ যদি এক রকমের খাদ্য খাওয়া যায়, তা হলে খাদ্য যত পুষ্টিকর ও মূল্যবানই হোক না কেন ভোজনকারীর কাছে তত তৃপ্তিকর না হওয়ায় ভোজনকালে মুখ থেকে পাচকরস নিঃসৃত হয় না। 

মনে রাখা উচিত— ভুক্ত খাদ্য ভালভাবে পরিপাক না হলে তার সারাংশ পাওয়া যায় না। এছাড়া প্রত্যেক ব্যায়ামকারীর খাদ্য গ্রহণের সাধারণ স্বাস্থ্যকর নিয়মটি মনে রাখা উচিত :- কঠিন ভোজ্য দিয়ে পেটের অর্ধেক পূর্ণ করবে, জলীয় পদার্থে সিকিভাগ ভর্তি করে পেটের অবশিষ্ট সিকিভাগ সব সময় বায়ু সঞ্চালনের জন্যে খালি রাখবেন। আয়ুর্বেদ শাস্ত্রেও এই মত। 
পুষ্টিকর খাদ্যের অভাব হলে শরীরের যেমন ক্ষতি হয়, অতি ভোজনেও সেরূপ ক্ষতি হয়। খাদ্যের অভাবে শরীরের ক্ষয়পূরণ ও পুষ্টিসাধন হয় না এবং অতি ভোজনের ফলে অজীর্ণ, অম্ল ও পাতলা দাস্ত প্রভৃতি পেটের অসুখ অনিবার্য হয়ে ওঠে।

শরীর সুস্থ রাখতে হলে মাঝে মাঝে উপোস  বা রোজা করা প্রয়োজন। যতদিন দেহের বৃদ্ধি হয়, ততদিন অর্থাৎ ২৪/২৫ বৎসর পর্যন্ত উপোস বা রোজা তেমন প্রয়োজন নেই। 

তবে মাসে ২/৩ দিন ছুটির দিনে সকাল থেকে বেলা ১২টা-১টা পর্যন্ত কিছু না খেয়ে ১২টা-১টার পর হাল্কা খাদ্য খেলে শরীর ভাল থাকে। 

অধিক পানি পানে অধিক প্রস্রাব হওয়ায় দেহে সঞ্চিত ময়লা ও জীবাণু মূত্রের সঙ্গে অধিক মাত্রায় বেরিয়ে যায়। তার ফলে দেহ নিরোগ হয়। এ ছাড়া সন্ধ্যা পর্যন্ত উপোস/রোজা পরিপাক যন্ত্র বিশ্রাম পাওয়ায় তার কাজ করবার শক্তি বাড়ে। 

সন্ধ্যার পর শরবৎ, ফল, ছানা ও ভেজা কাঁচামুগের ডাল খাওয়া দরকার। রোজার দিন পরিশ্রম করা উচিত নয়।