শবাসন
এই আসন-এ অবস্থানকালে শব অর্থাৎ মড়ার মত নিস্পন্দভাবে শুয়ে বিশ্রাম নিতে হয়। তাই এই আসনের নাম শবাসন।
প্রণালী
চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ুন। পা দুটি লম্বা করে দিন। দুপায়ের মাঝে এক ফুট থেকে দেড় ফুট ফাঁক থাকবে।
পায়ের গোড়ালি ভিতর দিকে থাকবে এবং আঙ্গুলগুলি বাহিরের দিকে থাকবে।
হাত দুটিও লম্বালম্বিভাবে নিজের সুবিধামতো শরীরের দুপাশে মাটিতে রেখে হাতের চেটো উপর দিকে রেখে শরীরটা যতটা পারুন শিথিল করে দিন। ২৯ নং ছবি দেখুন।
শরীর শিথিল করে দেওয়া মুখে বলা যত সহজ কাজে করা তত সহজ নয়। প্রথমে শরীরের নিচের অংশ পায়ের বুড়ো আঙ্গুল থেকে শুরু করে পায়ের অন্যান্য আঙ্গুল, পায়ের পাতা, কাফ, হাঁটু, থাই-এর মাংসপেশি এবং কোমর থেকে সমস্ত পা অর্থাৎ প্রতিটি অঙ্গকে চিন্তা করতে হবে এবং তাদের যেন ঘুম পাড়িয়ে দিতে হবে।
এইভাবে পিঠের, বুকের, কাঁধের এবং পরিশেষে ঘাড় ও মাথার মাংসপেশীগুলিকে শিথিল করে দিতে হবে। সর্বদাই লক্ষ্য রাখতে হবে শরীরের কোন স্নায়ুমন্ডলী এবং মাংসপেশী যেন বিন্দুমাত্র শক্ত হয়ে না থাকে।
এরপর মনটা দম নেওয়া এবং ছাড়ার উপর রাখতে হয়। এ অবস্থায় একভাবে অনেকক্ষণ ধরে দম নিতে এবং অনেকক্ষণ ধরে দম ছাড়তে হবে।
ঠিক যেন রাতের প্রহরীর মতো মনকে শরীরের সমস্ত অঙ্গ প্রত্যঙ্গের কাছে নিয়ে যেতে হবে। বহির্জগত থেকে মনকে সরিয়ে এনে সর্বদাই লক্ষ্য রাখতে হবে শরীরের শিথিলতা বজায় আছে কি না।
এই অবস্থায় বহির্জগতের কোন শব্দ শুনতে না পাওয়াই ভাল। শরীরের শিথিলতা অনুভব করার পরে নাক এবং কপালের সংযোগস্থল বা দুটি ভ্রু-র মাঝে দম নেওয়া এবং ছাড়ার সময় বাতাসের ঘর্ষণ অনুভব করতে হবে।
মনে হবে ঠাণ্ডা বাতাস নাক দিয়ে শরীরে প্রবেশ করছে আর গরম বাতাস নাক দিয়ে বাইরে আসছে। এ অবস্থায় নাকে কোন শব্দ হবে না।
যোগাসন অভ্যাস শুধু শারীরিকভাবে করলেই হবে না, চাই সম্পূর্ণ মানসিক প্রস্তুতি। তাই শবাসন অভ্যাসের সময় কল্পনা করতে হবে পৃথিবীতে নিজে এবং নিজের সত্তা ছাড়া আর কিছুই নেই।
নিজেকে ভাসিয়ে দিতে হবে মহাশূন্যে অথবা সমুদ্রে ভাসমান ডিঙ্গি নৌকার মতো। এই সময় বাস্তব জীবনের কোনও দেনা পাওনা এবং সাংসারিক দুশ্চিন্তা থাকবে না।
ঠিকমতো অভ্যাসের ফলে আমাদের প্রয়াতন্য অর্থাৎ নিউরো মাসকুলার ইউনিট্ এর উপর প্রভাব বিস্তার করায় আমাদের সমস্ত স্নায়ুমণ্ডলী শিথিল হয়।
আমাদের সারাদিনের চিন্তাচ্ছন্ন স্নায়ুগুলি বিশ্রাম পাবে, প্রশমিত হবে উত্তেজনা। শরীর পাবে পূর্ণ তৎপরতা এবং আভ্যন্তরীণ যন্ত্রাংশগুলি কর্মঠ হয়ে উঠবে।
সবচাইতে বেশী বিশ্রাম পাবে আমাদের ফুসফুস্ এবং হৃৎপিণ্ড।
অভ্যাসকারীরা যে কোন আসন অভ্যাসের সময় অর্থাৎ কোন একটি আসন-এ ২০/৩০ সেকেন্ড থাকাকালীন শবাসনের এই শারীরিক এবং মানসিক শান্তি এবং শিথিলতাকে বজায় রেখে অভ্যাস করলে অনেক বেশি উপকৃত হবে।
কোন কোন আসন অভ্যাসের পর উপুড় হয়েও শবাসন অভ্যাস করা যায়। ৩০ নং ছবি দেখুন। এইভাবে শবাসন অভ্যাস করাকে মকরাসন বলে।
উপকারিতা
মাংসপেশিগুলোকে শিথিল করে দেওয়ার ফলে এদের কর্মক্ষমতা আরও বেড়ে যায়। শিরার মধ্যে ভালভাবে রক্ত সঞ্চালিত হওয়ায় ক্লান্তি সহজে দূর হয়ে যায়।
যাঁরা অধিক রক্তের চাপের জন্য অসুস্থতাবোধ করেন তাঁদের এই আসন অভ্যাসে বিশেষ উপকার হয়।
ছাত্ররা যদি সমস্ত দেহ-মন ও স্নায়ুমণ্ডলী শিথিল ক'রে এই আসনটি দিনে ২০ মিনিট অভ্যাস করে, তাহলে তারা পরীক্ষার সময় অধিক রাত্রি পর্যন্ত পড়াশুনা করলেও তাদের স্বাস্থ্যহানি হবার সম্ভাবনা থাকে না।
চাকুরীজীবী ব্যক্তিরা যদি অফিসে টিফিনের অবসর সময় নিজ নিজ চেয়ারে বসে ৫/১০ মিনিট শরীরের সমস্ত মাংসপেশী ও স্নায়ুমন্ডলীকে শিথিল করে দেওয়ার পদ্ধতি অভ্যাস করতে পারেন, তা হলে একটানা দীর্ঘক্ষণ কর্মজনিত ক্লান্তি ৫/১০ মিনিটের মধ্যে দূর করে নবোদ্যমে বাকী কাজগুলো সুসম্পন্ন করতে পারবেন।
এছাড়া তাঁরা কর্মস্থল থেকে বাড়ি ফিরে হাত মুখ ধুয়ে কিছু খেয়ে ১০/১৫ মিনিট শবাসনে বিশ্রাম করলে দ্রুত ক্লান্তি দূর করে নতুন কর্মশক্তি লাভ করতে পারবেন।
উচ্চ রক্তচাপাক্রান্ত রোগীদের এই আসন বিশেষ প্রয়োজন। অভ্যাসকারীকে অবশ্যই মনে রাখতে হবে আমরা যতক্ষণ একটি ভঙ্গিমায় থাকি তখন যতটা উক্ত এর উপকারিতা লাভ করি। তার চাইতে অনেক বেশী উপকৃত হই আসন অভ্যাসের পর শবাসন করে।
সুতরাং এই শবাসনকে খুব ভাল করে উপলব্ধি করতে হবে। অনুভব করতে পারলে তবেই এর মধ্যে দিয়ে ঐশ্বরিক আনন্দ পাওয়া সম্ভব।

