ওষুধের অপকারিতা
আমরা প্রসঙ্গক্রমে ওষুধের অপকারিতার বিষয় বারবার উল্লেখ করেছি। আধুনিক যুগের যে সমস্ত খ্যাতনামা পাশ্চাত্য চিকিৎসক ঔষধের গুণাগুণ পরীক্ষা করেছেন তাদের কয়েকটি অভিমত পাঠকদের জন্য দেওয়া হলো-
ডা. মিচেল বলেন—“প্রত্যেক রোগেরই একটা অন্তর্নিহিত কারণ আছে, কোন ওষুধই রোগের সেই মূল কারণ দুর করতে পারে না।”
এলবার্ট হাবার্ড—“আমার বাবা ৬৭ বছর যাবৎ চিকিৎসা ব্যবসা করছেন কিন্তু আমি অসুস্থ হলে কখনও আমাকে ওষুধ সেবন করিতে দেননি।”
ডাক্তার ওয়ার্টেল—“যদি স্বাস্থ্যের উন্নতি করার ইচ্ছা থাকে তাহলে ওষুধ এবং ডাক্তার সম্পূর্ণ বর্জন করিবেন এবং এই নীতির উপর সুদৃঢ় আস্থা রাখবেন।”
প্রফেসার এলেঞ্জো ক্লার্ক, এম, ডি. বলেন, “নিরাময় করার জন্য চিকিৎসকরা রোগীর ভয়ানক সর্বনাশ করেন। বহু রোগীকে তারা দ্রুত মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেন। এই সব রোগীর উপর ওষুধ প্রয়োগ না করা হলে তারা প্রাকৃতিক নিয়মে অর্থাৎ নিজ নিজ জীবনীশক্তির জোরেই আরোগ্য লাভ করতো।
নিরাময়ের জন্য আমরা যতো ওষুধ আবিষ্কার করেছি তার সবই বিষাক্ত পদার্থ। এইজন্যই ওষুধের প্রত্যেকটি মাত্রা রোগীর জীবনীশক্তি হ্রাস করে। ওষুধ সেবনের পরও কতকগুলি রোগী আরোগ্য হয়। এই আরোগ্য লাভ ওষুধের গুণে নয়, তার জীবনীশক্তির প্রভাবে।”
ডাক্তার লিও বলেন,“মানুষ যত রকম ভয়াবহ বিষের সন্ধান পেয়েছে তার প্রায় সমস্তই এলোপ্যাথিক ওষুধের মধ্যে আছে। ওষুধের সাথে এই বিষ দেহে প্রবেশ করে দেহেই সঞ্চিত থাকে। তারপর এটা শরীরের যে কোন অংশে অথবা দেহ-পরিচালক যে কোন যন্ত্রে গিয়ে কেন্দ্রীভূত হয়। এবং ওই স্থানকে অথবা ওই দেহ-পরিচালক যন্ত্রকে সর্বদা ক্লিষ্ট করতে থাকে; ওই অঙ্গের বা যন্ত্রের প্রাণকোষগুলোও ওই বিষের প্রভাবে ধ্বংস হতে থাকে।
নুতন রোগে আমরা ঔষধ প্রয়োগে আরোগ্য করি। বলা বাহুল্য, এটা আরোগ্য নয়, নতুন রোগকে আমরা ওষুধবিষ দিয়ে চাপা দেই। রোগের প্রকাশকে স্তব্ধ রাখি। ওষুধবিষ দিয়ে এমন রোগ চাপা দেওয়ার ফলে ওই বিষের ধ্বংসক্রিয়ার পরিণামস্বরূপ দেহে দীর্ঘস্থায়ী রোগ উৎপন্ন হয় অথবা নানাবিধ জটিল দুরারোগ্য রোগের সৃষ্টি হয়।”
ডাক্তার নায়েস বলেন,“নিরাময়ের জন্য ওষুধ প্রয়োগের কোনো যথার্থ কারণ, কোন সদযুক্তি বা প্রয়োজন খুঁজে পাওয়া যায় না। আমার মনে হয়, এই চিকিৎসা ব্যবসা, এই চিকিৎসাকলা, এই ভুয়া চিকিৎসাবিজ্ঞান আগাগোড়া কতগুলো ভুল নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত। এই চিকিৎসা ব্যবসা মানুষের পক্ষেও ভাল নয়; এই ব্যবসা নীতি হিসাবেও অপরাধজনক এবং মানুষের স্বাস্থ্যের পক্ষেও ক্ষতিকারক।”
ডাক্তার ফ্রান্সিস গগসওয়েল বলছেন, “এই চিকিৎসা-ব্যবসা যদি আইনের সাহায্যে বিলুপ্ত করে দেওয়াা যেতো, তাহলে মানবজাতি বিশেষভাবেই লাভবান হইত।”
বৃটিশ মেডিকেল এসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি স্যার জেমস বে বলেন,“আমাদের রোগচিকিৎসা প্রণালী বিজ্ঞানসম্মত নয়; এটা সুন্দর কোন শিল্পও নয়, এটা শুধু লাভজনক ব্যবসা।”
ডঃ বিগেলাও বলেন, “ওষুধ বর্জন করে রোগীদের প্রাকৃতিক আরোগ্যবিধানের উপর যদি ছেড়ে দেওয়া যেতো তাহলে রোগীর বিপদ-আপদ ও মৃত্যুর সংখ্যা বিশেষভাবেই কমে যেতো।”
ডাক্তার জেমস জনসন বলেন,“নিজের বিবেক বুদ্ধি দিয়ে সমর্থিত এবং অভিজ্ঞতালব্ধ সত্যের ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে আমি ঘোষণা করছি সমস্ত সাধারণ চিকিৎসক, সার্জন, পুরুষ ও নারী ধাত্রী, ওষুধ প্রস্তুতকারক, ওষুধ বিক্রেতা এবং ওষুধ পৃথিবীর বুক থেকে যদি একেবারে বিলুপ্ত হয়ে যেতো, তাহলে রোগের সংখ্যা এবং মৃত্যুর সংখ্যা বর্তমানের তুলনায় বহুগুণে কমে যেতো।”
ডাক্তার ম্যাগেনডি (মেডিকেল কলেজ ছাত্রদের উদ্দেশে প্রদত্ত বক্তৃতার অংশবিশেষ) বলেন, “ওষুধ ব্যবসা একটি মস্ত বড় প্রবঞ্চনা অর্থাৎ এটা মহা অনিষ্টকর। আমরা জানি, এটাকে বলে চিকিৎসাবিজ্ঞান। বিজ্ঞানই বটে! তবে বিজ্ঞানের বিশেষ জ্ঞান বা সুপরীক্ষিত জ্ঞান এর মধ্যে নাই। চিকিৎসকেরা প্রবঞ্চক না হইলেও আত্মপ্রতারক অর্থাৎ বিচার-বিবেচনা প্রয়োগ না করিয়া তারা গতানুগতিক পথেই চলেন।
আমি যখন ডিউ নামক হাসপাতালের পরিচালক ছিলাম, তখন ওষুধের দোষগুণ পরীক্ষার জন্য আমি কি করেছিলাম তা আপনাদের জানাচ্ছি। বছরে ৩/৪ হাজার রোগীর চিকিৎসা আমাদের করতে হতো। আমি রোগীদের তিন শ্রেণীতে ভাগ করেছিলাম। এক শ্ৰেণীকে নির্বিচারে আধুনিক চিকিৎসাশাস্ত্রসম্মত ব্যবস্থাপত্র ও ওষুধ দিতাম।
দ্বিতীয় শ্রেণীকে ওষুধের পরিবর্তে খাদ্যবটিকা এবং রং করা পানি দিতাম। বলা বাহুল্য, রোগীরা যাতে আমার এই প্রতারণা ধরতে না পারে, সেই বিষয়ে সতর্ক থেকেই এমনটা করতাম। মাঝে মাঝে আমি তৃতীয় শ্রেণীর সৃষ্টি করতাম। এই তৃতীয় শ্রেণীর ওষুধের আবেদন নির্মমভাবে প্রত্যাখ্যান করতাম। আমার এই প্রত্যাখ্যানে তারা বিশেষভাবেই বিরক্ত হতো।
তারা ধরে নিতো যে তাদের ইচ্ছাকৃতভাবে উপেক্ষা করা হচ্ছে। নিজের মনের খুতখুতির দরুণ এই দুর্বলচিত্তের মানুষগুলো সত্যি সত্যিই অসুস্থ হয়ে পড়তো। কিন্তু প্রকৃতি তাদের রক্ষায় অগ্রসর হতো। ফলে এই তৃতীয় শ্রেণীর রোগীরা এমনিতেই অল্প সময়ের মধ্যে আরোগ্য লাভ করতো।যাদের আমি ওষুধের পরিবর্তে খাদ্যবটিকা এবং রং করা পানি দিতাম, তাদের মাঝেও প্রায় কেউই মৃত্যুমুখে পড়তো না। কিন্তু চিকিৎসাশাস্ত্রের চুলচেরা বিধান অনুযায়ী যাহাদের আমি ওষুধ দিতাম, তাদের মাঝেই অনেক রোগীর মৃত্যু হতো।”
ডা. হেস্টিংস বলেন, “২৫ বছর ধরে চিকিৎসা-ব্যবসা পরিচালনার পর চিকিৎসা সম্বন্ধে আমারও অভিমত সেক্সপিয়ারের শিষ্যের মতো, যিনি বলেছিলেন, ‘এই চিকিৎসাশাস্ত্রগুলোকে আবর্জনার মাঝে ছুঁড়ে ফেলো’।”
ডাক্তার বেকওয়েল, এম. ডি, এম. আর. সি. এস (ভূতপুর্ব টিকাপ্রদান বিভাগের সর্বাধ্যক্ষ, চিকিৎসা বা স্বাস্থ্যোন্নতির বিভাগের উচ্চপদস্থ কর্মচারী, বসন্তরোগের নিদান ও চিকিৎসা বিষয়ক গ্রন্থ প্রণেতা) বলেন, “টিকা গ্রহণের সুফল সম্বন্ধে আর আমার কোনা বিশ্বাস নাই। মহামারীর হাত থেকে সাধারণকে রক্ষা করার জন্যই হোক বা রোগের প্রকোপ কমানোর জন্যই হোক, টিকার উপর নির্ভর করা চলে না।
এ বিষয়ে আমি নিজেও ভুক্তভোগী। বিশেষভাবে দ্বিতীয় বার টিকা নেওয়ার পরও ৬ মাসের মধ্যেই আমি বসন্তরোগে আক্রান্ত হয়েছিলাম।”
ডাক্তার জে. এন. হার্টি (ব্রিটিশ ভারত সরকারের স্বাস্থ্যসভার সদস্য) বলেন, “পৃথিবীতে আজ পর্যন্ত এমন কোন ওষুধ আবিষ্কৃত হয়নি যার মধ্যে দেহের পক্ষে ক্ষতিকর কোনো উপাদান নাই।”
বোস্টওয়িকসের ‘হিস্টরী অব মেডিসিন’ গ্রন্থে বলেছেন, “ওষুধ পাকস্থলীতে গিয়ে দেহস্থ যন্ত্রগুলোর কতখানি ক্ষতি বা উপকার করে এই সম্বন্ধে মানুষের জ্ঞান অত্যন্ত সীমাবদ্ধ। সুতরাং ওষুধের প্রত্যেকটি মাত্রা রোগীর জীবনীশক্তির উপর চিকিৎসাবিজ্ঞানের ‘এলোপাথাড়ী’ অজ্ঞ গবেষণার মত অনিষ্টকর।”
ডাক্তার হাচিনসন বলেন, “ওষুধ প্রস্তুতে আফিম ও মদ্যসার ব্যবহার নিষিদ্ধ হলে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে পেটেন্ট ওষুধ ব্যবসার মেরুদণ্ড ভেঙ্গে পড়বে, পেটেন্ট ওষুধ ব্যবসা অচল হয়ে পড়বে।”
আমাদের মন্তব্য
ওষুধ কোন রোগীর পক্ষে কতটা প্রয়োজন তা সঠিক নির্ণয় করার সাধ্য কোনো চিকিৎসকের নাই। এই ওষুধ নিয়েও রোগীর “Blind experiment” অর্থাৎ ‘এলাপাথারী গবেষণা’ চলে।
এইজন্যই এসব ওষুধে কোনো রোগী ভালো হয়, আবার কোন রোগী ভালো হয় না। ‘থাইরয়েড’ এর মতো সমস্যায় ওষুধের মাত্রা পরিমাণের চেয়ে বেশী হলে সমস্ত দেহ বিষাক্ত হয়ে রোগীর মৃত্যু পর্যন্ত ঘটতে পারে।
সুতরাং ওষুধ নির্ভরযোগ্য নয়।ওষুধ বেপরোয়া প্রয়োগের ফলে কোনো কোনো রোগী হঠাৎ মৃত্যুমুখে পতিত হয় ; অনেক রোগী সাময়িকভাবে উন্মাদ হয়ে যেতে যায়।
অতিরিক্ত ওষুধ সেবনের কারণে এমন উন্মাদ হয়ে যাওয়া মানুষের সংখ্যা আমাদের দেশে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক। আমাদের দেশের স্বাস্থ্যবিভাগ থেকে এসব হতভাগ্যদের সঠিক সংখ্যা নির্ধারণের চেষ্টা কখনোই হয়নি।
আজকাল এন্টিবায়েটিক ওষুধের প্রাধান্য চলছে। নিত্য নতুন শক্তিশালী এন্টিবায়েটিক ওষুধ (ট্রেপটোমাইসিন, টেরামাইসিন, সেক্রোমাইসিন প্রভৃতি) আবিষ্কৃত হচ্ছে। এসব ওষুধের আবিষ্কারকদের উদ্দেশ্যের প্রতি আমরা কোন দোষারোপ করছি না।
এসব ওষুধের আবিষ্কারকরা এবং প্রাচীন ও অর্বাচীন সব রকম ওষুধের আবিষ্কারকরাই শ্রদ্ধার পাত্র। মানবকল্যাণের প্রতি দৃষ্টি রেখে মানবের রোগমুক্তি কামনায় বহু পরিশ্রম ও বহু গবেষণার ফলে তারা এসব ওষুধ আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছেন। এসব ওষুধের সাহায্যে রোগীকে রোগমুক্ত করে দেশের সেবা করছেন, দেশের কল্যাণ করছেন।
কিন্তু এদের উদ্দেশ্য মহৎ হলেও এসব ওষুধ প্রয়োগের পরিণাম কেমন তাও পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে আমাদের বিচার করে দেখতে হবে। দিন দিন যতই অব্যর্থ ওষুধ আবিষ্কার হচ্ছে ততই মানুষের স্বাস্থ্য বিপন্ন হচেছ, মানবদেহ রোগপ্রবণ হয়ে উঠছে, রোগের উৎপাতে গৃহস্থের শান্তিময় সংসার দুঃখ-অশান্তির লীলাভূমি হয়ে উঠছে; অকালমৃত্যুর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।
গৃহস্থের কষ্টার্জিত আয়ের অধিকাংশই ওষুধবিক্রেতাদের ও চিকিৎসকদের পকেটে চলে যাচ্ছে। গরীব ও মধ্যবিত্ত গৃহস্থেরা ক্রমশঃ অধিকতর নিঃস্ব হয়ে দেশের বাড়াচ্ছে।
সুতরাং ওষুধের আপাত আরাগ্যকারী সুফল দেখে বিমোহিত হলে চলবে না। এর বিষময় পরিণামের কথা স্মরণ করে গৃহস্থদের সাধ্যমত ঔষধ ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে হবে।
পেনিসিলিন প্রয়োগে হঠাৎ সবল রোগীর মৃত্যু হয়েছে, স্ট্রেপটোমাইসিন প্রয়োগে রোগীর মস্তিষ্কবিকৃতি ঘটেছে এটা আমাদের প্রত্যক্ষ ঘটনা। ওষুধ সম্বন্ধে আমরা যেমন মনোভাব পোষণ করি , বাংলাদেশের ডাক্তারদের মাঝেও কেউ কেউ এমন ওষুধবিরোধী মনোভাব পোষণ করতে আরম্ভ করেছেন দেখে এটাকে শুভ লক্ষণ মনে হয়েছে।
ওষুধের অপকারিতা সম্বন্ধে ভারতবর্ষের তৎকালীন ‘যুগান্তর’ পত্রিকায় প্রকাশিত জনৈক এলোপ্যাথিক চিকিৎসকের ভাষণটি আমরা উদ্ধৃত করছি-
“স্ট্রেপটোমাইসিন প্রয়োগে বহুসংখ্যক রোগীর মস্তিষ্কবিকৃতি ঘটে। স্যার আলেকজাণ্ডার ফ্লেমিং, লর্ড হাল্ডোর এবং হারিস ইভান্স প্রমুখ বিশ্ববিখ্যাত চিকিৎসকগণ পেনিসিলিন, স্ট্রেপটোমাইসিন, ক্লোরোমাইসিটিন অর্থাৎ সালফা-ড্রাগস প্রভৃতি এন্টিবাযয়েটিক (Antibiotic) ওষুধের প্রয়োগ সম্বন্ধে চিকিৎসকদের সতর্ক করেছেন।
সম্প্রতি আরও কতকগুলো ওষুধ বের হয়েছে—সিনকোমাইসেটিন, টেরামাইসিন, নিওমাইসিন, সেক্রোমাইসিন, সেপামাইসিন প্রভৃতি। এসব এন্টিবায়েটিক ওষুধ কেবলমাত্র বিজ্ঞাপনের উপর নির্ভর করে প্রয়োগ করায় ডাক্তারদের চিন্তাশক্তি কমছে। সঙ্গে সঙ্গে রোগীদের স্বাস্থ্য ও জীবন ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
এটা সত্যি যে এন্টিবায়েটিক ওষুধ প্রয়োগের ফলে রক্তের লাল কণিকাগুলি মরে যায়, হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া দুর্বল হয়, কিডনির ক্ষতি সাধিত হয়, রোগী বেঁচে গেলেও ভগ্নস্বাস্থ্য নিয়ে জীবন যাপন করেন।”
[উল্লিখিত অংশের লেখকের নামটি কোনা কারণে অস্পষ্ট হওয়ায় লেখকের নামের পাঠোদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।]
সুতরাং ওষুধ, ইনজেকশন, টিকা প্রভৃতির সাহায্যে রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। এটা শুধু স্বাস্থ্যের অবনতিতেই সহায়তা করবে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, ওষুধ দিয়ে রোগ বন্ধ করে দিলে তা অন্য রোগে পরিণত হয়। ওষুধ দিয়ে মেহরোগ বন্ধ করলে হাইড্রোসিল রোগ হয়। ওষুধ দিয়ে উপদংশ রোগ চাপা দিলে তা দুরারোগ্য পক্ষাঘাত রোগে রূপ নেয় অথবা কঠিন বাতব্যাধিরূপে আত্মপ্রকাশ করে।
ছেলেদের হাম, ডিপথেরিয়া, মেনিনজাইটিস, মাস প্রভৃতি রোগ ওষুধ দিয়ে তাড়াতাড়ি বন্ধ করে দিলে তা যক্ষা, ক্যানসার অথবা মুত্রাশয় সম্বন্ধীয় কঠিন রোগ আকারে ফিরে আসে। অর্থাৎ ওষুধ দিয়ে রোগ চাপা দেওয়ার ফলেই নানা দুরারোগ্য ব্যাধি আবার দেহকে আক্রান্ত হয়।
এন্টিবায়েটিক ওষুধের আবিষ্কারকেরা তাঁদের আবিষ্কৃত ওষুধের অসাধারণ গুণ সম্বন্ধে বর্তমানে দাবি করুন না কেন— চিকিৎসকেরা এর গুণ দেখে যতই মুগ্ধ হোন না কেন, এসব ওষুধের মারাত্মক কুফল সম্বন্ধে মানবসমাজ ক্রমশঃই সচেতন হয়ে উঠছে।
এসব ওষুধ যেমন রোগজীবাণু নষ্ট করে, তেমনি আবার দেহের জন্য মহা উপকারী লাল-রক্তাণুগুলিকেও ধ্বংস করে শরীরের রক্তকে দুর্বল, নিস্তেজ এবং যে কোনো মারাত্মক রোগাক্রমণের অনুকূল করে তোলে।
মনে রাখতে হবে এসব ভয়াবহ ওষুধবিষ সাময়িকভাবে রোগ চাপা দেয় এবং বিষাক্ত ওষুধ গ্রহণের অবশ্যম্ভাবী পরিণতিস্বরূপ দেহের জীবনীশক্তি নষ্ট করে। দেহে আবার নতুন নতুন রোগ সৃষ্টি হয় এবং ওই ঔষধজাত বিষ সন্তানদের মধ্যে সংক্রমিত হয়।
এজন্যই আজকাল নবজাত শিশুদের মধ্যেও যকৃতরোগ, স্নায়ুরোগ, চক্ষুরোগ, মৃগীরোগ প্রভৃতির অত্যধিক প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। অধিকাংশ বিকলাঙ্গ শিশুর উৎপত্তির মূল কারণও এই ওষুধবিষ।
স্কুল-কলেজে পাঠরত এমন সব ছেলে-মেয়েরাও আমাদের কাছে আসে টাইফয়েড রোগে যাদের উপর এন্টিবায়েটিক ওষুধ প্রয়াগ করা হয়েছে। এসব এন্টিবায়েটিক ওষুধ গ্রহণের ফলে ওইসব ছেলেমেয়েদের স্মৃতিশক্তি ও মস্তিষ্ক পরিচালনাশক্তি নষ্ট হয়ে গেছে। এজন্য তাদের পড়াশুনাও বন্ধ রাখতে হয়েছে।
এসব ছেলে-মেয়েরা আমাদের নির্দেশমত আসন-মুদ্রাদি অভ্যাস করে এক বছরে মধ্যেই নষ্ট স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধার করে পুনরায় স্কুল-কলেজে গিয়ে ভর্তি হয়েছে। এসব ছাত্র-ছাত্রীর মাঝে নামকরা চিকিৎসকদের ছেলে-মেয়েরাও আছে।
ডাক্তাররাও এক্ষেত্রে যৌগিক চিকিৎসার শরণাপন্ন হওয়াই সঙ্গত মনে করছে। এটা শুভ লক্ষণ।
সূত্র: যোগবলে রোগা-আরোগ্য, শ্রীমৎ স্বামী শিবানন্দ সরস্বতী।
