ওষুধের অপকারিতার বিষয়ে আমরা বিশেষভাবে আলাচনা করেছি কিন্তু তবুও আমাদের এটা মনে রাখতে হবে মানব কল্যাণে মানুষ যত কিছু আবিষ্কার করেছে কোনো যুগেই এর  প্রয়োজন একেবারে নিঃশেষ হয় না। ওষুধের মাঝে সব যুগের গ্রহণীয় কিছু না কিছু উপাদান আছে। 

আমাদের এই যুগে উড়োজাহাজ হয়েছে, ঘণ্টায় আমরা ৩০০/৪০০ মাইল বেগে আকাশ পথে যাতায়াত করতে পারি। কিন্তু তবুও প্রাচীন যুগের অতি মন্থরগামী গরুর গাড়ির  প্রয়োজন এখনও শেষ হয়নি। তেমনি চালকল প্রতিষ্ঠিত হওয়া সত্ত্বেও আমাদের দেশেরসনাতন ঢেঁকিএখনো অস্তিত্ব বজায় রেখেছে। 

দেহের কোনো স্থান অগ্নিদগ্ধ হলে অবিলম্বে সেই দগ্ধস্থান ঠাণ্ডা পানির মাঝে ডুবিয়ে রাখতে হয়। দহনের অনুপাত অনুযায়ী দগ্ধস্থান পানিতে ডুবিয়ে রাখার সময়ও একঘণ্টা থেকে ৩/ ঘণ্টা বা তদূর্ধ্ব। এমন চিকিৎসায় দন্ধস্থানে ফোসকা পড়ে না, দক্ষস্থানের জ্বালা-যন্ত্রণা সহজেই নিরাময় হয়, দেহে দহনজনিত কোন দাগও পড়ে না। 

বাহ্যিক ওষুধ প্রয়োগে সমস্যা নেই

সারা শরীর সর্বাঙ্গ ভয়াবহরূপে দগ্ধ হলেও একমাত্র নাক-মুখ ছাড়া আর সর্বাঙ্গ দরকার মতো ২৪ ঘণ্টা থেকে ৭২ ঘণ্টা পর্যন্ত পানিতে ডুবিয়ে রাখার  প্রয়োজন হয়। জল-চিকিৎসকেরা পোড়া রোগীর  আরোগ্যে এই যে উপায়টি আবিষ্কার করেছেন অগ্নিদাহে এর সমমানের কোনো চিকিৎসা-প্রণালীও আজ পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়নি। কোনো ওষুধের এমন সাধ্য নাই অগ্নিদগ্ধ রোগীকে এমন সহজে আরোগ্য করে। 

সুতরাং প্রাচীন এবং আধুনিক চিকিৎসাবিদ্যার এমন কতকগুলি দান আছে, এমন কতকগুলি আবিষ্কার আছে যার প্রয়োজন কোনো যুগেই নিঃশেষ হবে না। | 

আমাদের দেহের কোনো স্থান কেটে গেলে আমরা বিশল্যকরণী, দূর্বাঘাস, চন্দন, আয়োডিন (Iodine) অথবা ব্যাঞ্জোইন (Banzoin) প্রয়োগ করি। ওষুধ  প্রয়োগে  কাটা স্থান বিষাক্ত হতে পারে না সুতরাং এই ওষুধ কাটা স্থানকে দ্রুত আরোগ্যে সহায়তা করে। 

চর্মরোগ সৃষ্টি হলে, দেহের কোনো অঙ্গে ক্ষত হলে আমরা মলম ব্যবহার করি। এইসব মলম ক্ষতস্থানের বিষ নষ্ট করে ক্ষতস্থানকে দ্রুত নিরাময় করে। সুতরাং এই শ্রেণীর ঔষধের প্রয়োজনীয়তা বর্তমানেও আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে।

কোনো দুর্ঘটনার ফলে বা হঠাৎ কোনো ভয়াবহ রোগের আক্রমণের ফলে রোগীর জীবনীশক্তি যখন স্তিমিত হয়ে পড়ে, রোগী মৃতকল্প হয়ে পড়ে, তখন চিকিৎসক রোগীর দেহে গ্লুকোজ (Glucose) ইনজেকশন দেন অথবা স্যালাইন (Saline) ইনজেকশন দেন। এই গ্লুকোজ এবং স্যালাইন ওষুধ নয়, এগুলো দেহের প্রয়োজনীয় খাদ্য। 

ফলের রসের মাঝে, বিশেষভাবে আঙ্গুর ফলের রসে যে চিনি পাওয়া যায়; ওই চিনির দিয়ে গ্লুকোজ তৈরি হয়। চিনিই আমাদের শরীরের তাপ রক্ষা করে, দেহের শক্তি অটুট রাখে। 

তরিতরকারী ও ফল প্রভৃতির মধ্যে যে ধাতব লবণ থাকে, তা বৈজ্ঞানিক উপায়ে সংগ্রহ করে স্যালাইন তৈরি হয়। এই স্যালাইন ইনজেকশনে রক্তের ক্ষারধর্ম বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয়, গ্লুকোজ ইজেকশনে রোগীর দেহে তাপ এবং শক্তি সঞ্চারিত হয়। 

সুতরাং গ্লুকোজ এবং স্যালাইন ইনজেকশনের পরেই রোগী খানিকটা সবল হয়ে ওঠে, রোগের প্রবলতা খানিকটা স্তিমিত হয়। রোগীর এই সাময়িক সবলতায় চিকিৎসকেরা রোগীকে যথোচিতভাবে চিকিৎসা করার সময় সুযোগ পান। 

পুড়ে গেলে পানিতে পোড়া স্থান পানি ‍চুবিয়ে রাখুন

পুড়ে গেলে পোড়া স্থান ঠাণ্ডা পানিতে চুবিয়ে রাখুন

বহুমূত্র বা ডায়বেটিস রোগের প্রবলতায়
ইনসুলিন ইনজেকশন দিয়ে চিকিৎসক মৃত্যুর হাত থেকে বহু রোগীকে সাময়িকভাবে রক্ষা করেন। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের এগুলো উপকারী দিক।

কিন্তু ইনজেকশন প্রথা রোগীর দেহে যদি নানাবিধ ওষুধ-বিষ ঢুকানোর কাজেই প্রযুক্ত হয়, তাহলে এটা মানব সমাজের জন্য মহা অনিষ্ট, মহা অকল্যাণই সাধন করবে।

বলা বাহুল্য, এই অনিষ্টকর কাজেইইনজেকশন বর্তমান যুগে প্রয়োগ হচ্ছে। সব রকম রোগের চিকিৎসাতেই আজকাল বেপরোয়া ইনজেকশন চলে; ওষুধবিষ দিয়ে রক্তকে দুর্বল করা, নিস্তেজ করার অমোঘ উপায় ইজেকশন। 

অস্ত্রোপচারের সাহায্যে আসন্ন মৃত্যুর হাত থেকে বহু রোগীকে চিকিৎসকেরা রক্ষা করেন; আবার বহু রোগীকে তারা অকালে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেন। সুতরাং অস্ত্রোপচার পদ্ধতিরও সীমাবদ্ধ প্রয়োজনীয়তা আছে। 

অসাধু ব্যবসায়ীরা খাদ্যে ভেজাল মিশিয়ে কালোবাজার সৃষ্টি করে দেশের যে সর্বনাশ করছেন চিকিৎসকেরা সাধু উদ্দেশ্য প্রণোদিত হয়েও দেশের সেই সর্বনাশই করছেন। 

জনসাধারণের স্বাস্থ্য সম্বন্ধে অজ্ঞতা, ভেজাল খাদ্য এবং চিকিৎসকগণ কর্তৃক রোগে বেপরোয়া ওষুধ  প্রয়োগএই তিন কারণে আমাদের দেশবাসীর স্বাস্থ্য বিপন্ন হচ্ছে। 

কোন জিনিষ আমাদের খাওয়া উচিত, কোন জিনিস আমাদের খাওয়া উচিত নয় তা নির্ধারণ করার জন্য আমাদের  জিহ্বাকে প্রহরী রূপে কাজ করে। জিহ্বা যে বস্তুগুলোকে খাওয়ার জন্য ছাড়পত্র দেয়, সেগুলোই  শুধু দেহের পক্ষে কল্যাণকর। আর জিহ্বা যেগুলোকে পেটে যেতে দিতে অনিচ্ছুক, সেগুলো দেহের পক্ষেও অকল্যাণকর। 

এই প্রাকৃতিক বিধানকে আমাদের সব সময় মনে রাখা উচিত। এই প্রাকৃতিক বিধানকে লঙ্ঘন করলে তার শাস্তি হতে  কেউই পরিত্রাণ পাবে না। 

নিমপাতা ভাজা, নিম-বেগুন ভাজা, করলা বা উচ্ছে ভাজা, পাটপাতা ভাজা প্রভৃতি তিতা খাদ্যগ্রহণে আমাদের জিহ্বা আপত্তি করে না, বরং এগুলো গ্রহণে আগ্রহ প্রকাশ করে। আমাদের দেহস্থ পিত্তকে সমমতায় রাখার জন্য এই তিতা খাদ্যগুলোর প্রয়োজনীয়তা আছে বলেই এগুলোর তিক্ত স্বাদ সত্ত্বেও আমাদের রসনায় তা সুস্বাদু লাগে। 

অন্যদিকে, অত্যন্ত কটু বা তিক্ত স্বাদসম্পন্ন ওষুধগুলো আমাদের দেহের পক্ষে ক্ষতিকর বলেই আমাদের জিহ্বা সেগুলোকে ছাড়পত্র দিতে চায় না। কিন্তু তবুও জোর করে এসব ওষুধ আমরা সেবন করি। 

এইসব ওষুধবিষে যকৃৎ, প্লীহা, মূত্রযন্ত্র প্রভৃতি দেহরক্ষাকারী যন্ত্রগুলোর কত ভয়াবহ ক্ষতি হয়, বিভিন্ন গবেষণায় তা দেখে গেছে। 

সুতরাং ওষুধে উপকার হয় যতটুকু, অপকার হয় তার চেয়ে ঢের বেশীএটা স্মরণে রেখে ওষুধ সেবন সর্বদা বর্জন করে চলতে হবে। ওষুধবিষ দেহে সঞ্চিত হয়ে দুরারোগ্য ব্যাধি সৃষ্টি করে, রোগীর অকালমৃত্যু ঘটায়। এটা স্মরণে রেখে ওষুধ সেবনের ব্যাপারে সাবধান থাকতে হবে। 

যেসব ওষুধ দেহে বাহ্যিকভাবে প্রয়োগ করা হয়, মালিশরূপে প্রয়োগ করা হয়, শুধু সেই সব ওষুধের ব্যবহার বহিরঙ্গে প্রয়োগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখবেন।

সূত্র: যোগবলে রোগা-আরোগ্য, শ্রীমৎ স্বামী শিবানন্দ সরস্বতী।