বালকেরা যখন কৈশোরে পদার্পণ করে তখন তাদের দেহ-মনে ধীরে ধীরে একটা পরিবর্তন আসে—মুখে গোঁফ, দাড়ি গজাতে শুরু করে, গলার স্বর একটু মোটা হয় এবং মনে একটা ভীষণ চাঞ্চল্য আসে।

সাধারণতঃ ১২ থেকে ১৬/১৭ বৎসর বয়সের মধ্যে স্বাভাবিকভাবে প্রকৃতির কল্যাণে আমাদের এই পরিবর্তন সাধিত হয়। এই সময়ে 'থাইমাস' গ্রন্থি নিষ্ক্রিয় হয়ে আসতে থাকে এবং গোনাডস্ বা প্রজনন গ্রন্থি অধিকমাত্রায় সক্রিয় হওয়ায় শারীরিক ও মানসিক উদ্দীপনার সঙ্গে সঙ্গে দেহমনে যৌন বোধ বা যৌবনের প্রবৃত্তি আস্তে আস্তে দেখা যায়।

এসময় যৌন আকঙ্খা জাগ্রত হয়। কিশোর দেহে প্রজননগ্রন্থির কাজ বেড়ে যাওয়ায় প্রজননগ্রন্থির সহায়ক শুক্রকীট সৃষ্টি হতে থাকে।

এই শুক্রকীট, প্রজননগ্রন্থিরসের মধ্যে আমাদের দেহের নিম্নভাগে শুক্রাশয়ে জমতে থাকে। এই থলি ভর্তি হয়ে গেলে রাত্রে যখন আমরা ঘুমাই, তখন আমাদের অজ্ঞাতসারে এই অতিরিক্ত সঞ্চিত গ্রন্থিরস শুক্রকীটসহ আমাদের জননেন্দ্রিয়ের পথ দিয়ে বের হয়ে যায়। একে সুপ্তিস্খলন ‘নকট্যারনল্ রিমিশন' বলে।

এর সময়কাল সকলের এক রকম নয়। সাধারণতঃ মাসে ২/৩ বার, কারও মাসে ৪/৫ বারও সুপ্তিস্খলন হয়। সুপ্তিস্খলন স্বাভাবিক ব্যাপার এবং সুস্থ দেহীর পক্ষে মোটেই ক্ষতিকর নয়।


এই কথা সত্য যে, শুক্র দেহগঠনের ও দেহ পুষ্টির অন্যতম উপাদান। দেহ গঠনের ও পুষ্টিসাধনের পর যে অতিরিক্ত শুক্র আমাদের দেহে সঞ্চিত থাকে—তার কিয়দংশ রাত্রে স্বপ্নের মধ্যে মাঝে মাঝে ক্ষরিত হয়ে যায়।

এ ছাড়া অনেক সময় মলত্যাগ করার সময় বিশেষ করে যাদের অল্প কোষ্ঠকাঠিন্য আছে, তারা যখন কোঁথ দিয়ে মলত্যাগ করে, তখন ওই সঞ্চিত শুক্রের কিছু অংশ খড়িগোলা জলের মত তাদের প্রস্রাবের সঙ্গে বের হয়ে যায়।

অবিবাহিত যুবকদের পক্ষে মাসে ৩/৪ দিন রাত্রে সুপ্তিস্খলন বা অবিবাহিত যুবকদের এবং বিবাহিত ব্যক্তিদেরও মলত্যাগের সময় প্রস্রাবের সাথে উপরে বর্ণিত শুক্রের বহির্গমন তাদের উভয়েরই স্বাস্থ্যের কোন ক্ষতি তো করেই না বরং অপ্রয়োজনীয় সঞ্চিত শুক্র এইভাবে তাদের দেহ থেকে ক্ষরিত হলে তাদের কাম চিন্তা ও কামোত্তেজনার প্রবলতা কতকটা হ্রাস হওয়ায় তাদের পক্ষে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য ও ভারসাম্য রক্ষা সহজসাধ্য হয়ে পড়ে।


কিন্তু বড়ই দুঃখের কথা আমাদের কিশোরদের কৈশোর থেকে যৌবনে পদার্পণের সন্ধিক্ষণে— তাদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সময়ে, যখন তাদের কিশোর মন যৌন-বোধ সম্পর্কীয় প্রশ্নে ভরপুর হয়ে ওঠে এবং হঠাৎ এই পরিবর্তনের জন্যে অজ্ঞানতাজনিত ভয়ে ও দুশ্চিন্তায় যখন তারা অস্থির হয়ে পড়ে, তখন তাদের আমরা অশ্লীলতার দোহাই দিয়ে কিছু জানতে দিই না।


এই সব সরল অনভিজ্ঞ কিশোররা হয় বয়স্ক অসৎ লোকের খপ্পরে পড়ে, না হয় অজ্ঞ অসাধু ব্যবসায়ীদের বিজ্ঞাপন পড়ে অর্ধসত্য ও উদ্দেশ্যমূলক যৌন জ্ঞান লাভ করে বিপথগামী হয়, নয়তো ভীষণ অশান্তিতে দিন কাটায় এবং তাদের খপ্পরে পড়ে অর্থের অপচয় করে। সুপ্তিস্খলনে যত শারীরিক ক্ষতি হয়, তার চেয়ে শতগুণ বেশী ক্ষতি হয়—অজ্ঞানতা-জনিত মানসিক অশান্তিতে।


তারা যদি কৈশোরের প্রারম্ভে এই সম্বন্ধে সহজ ও স্বাভাবিক জ্ঞান লাভ করে, অর্থাৎ তারা যখন ১৩/১৪ বৎসর বয়সে পদার্পণ করে তখন যদি তাদের অভিভাবকরা, পিতা, মাতা বা শিক্ষকেরা এই স্বাভাবিক পরিবর্তনের কথা খোলাখুলিভাবে তাদের জানিয়ে দেন এবং তাদের যৌনচেতনা যাতে স্বাভাবিকভাবে জাগরিত হয় তার জন্যে তাদের সাহায্য করেন তাহলে কৈশোর থেকে যৌবনে সুস্থ ও সবল দেহমন নিয়ে পদার্পণ করতে পারে এবং তাদের ভবিষ্যৎ জীবন সুখের ও শান্তিময় হয়।


বাল্যকাল থেকে কৈশোরে বা যৌবনে পদার্পণ করবার সময় আমাদের মনে রাখা উচিত, এই সময় যে পরিবর্তন ও চাঞ্চল্য আমরা দেহমনে অনুভব করি তা খুবই স্বাভাবিক। আমাদের পিতা, পিতামহ ইত্যাদি পূর্বপুরুষেরা সকলেই এই বয়সে এইরূপ অবস্থার মধ্য দিয়ে পার হয়েছেন। আমাদের পরে যারা আসবে তাদের সকলকেই এইরূপ সন্ধিক্ষণে এইরূপ অবস্থার মধ্য দিয়েই কিছুকাল যেতে হবে।


সাধারণতঃ দেহমনের এইরূপ অস্থির অবস্থা ৪/৫ বছরের বেশী থাকে না। এই সময় যাতে দেহ ও মন নিজের বশে থাকে তার জন্যে ভাল বই পড়া, সৎসঙ্গে মেলামেশা, ব্যায়াম বা খেলাধুলার দ্বারা দৈহিক শক্তির কিছুটা ব্যয়িত করে দেহের উত্তেজনাকে প্রশমিত করা।


এক কথায়, দেহ ও মন কোনো সময় অলস না রেখে, তাদের এই সময় কোনো না কোনো সৎ কাজে ও সৎ চিন্তায় ব্যাপৃত রাখা দরকার। যারা এই সময়ে সৎকাজে ও সৎ চিন্তায় সময় কাটায়, তাদের এই সন্ধিক্ষণ কীভাবে কেটে যায়, অনেকেই তা ভালভাবে টের পায় না।


আর সেইসব অভাগা যুবকেরা, যারা কৈশোরের স্বাভাবিক যৌনবিকাশ সম্বন্ধে কোন উপদেশ না পেয়ে অসৎ বন্ধুর পরামর্শে বা আদর্শে স্বেচ্ছায় অস্বাভাবিকভাবে বীর্যক্ষয় করে পরে স্বাস্থ্যহীন হয়ে মানসিক দুশ্চিন্তায় জীবন কাটাচ্ছে তাদেরও হতাশ হওয়ার কোন কারণ নেই।


তাদের কয়েকটি খালি হাতে ব্যায়াম -এর সঙ্গে সামর্থ্যমত বিশেষ কয়েকটি যৌগিক ব্যায়াম নিয়মিত অভ্যাস করতে হবে। যথা— গোমুখাসন, ভদ্রাসন বা গোরক্ষাসন, মহাবদ্ধমুদ্ৰা, মহামুদ্রা, শক্তিচালনী মুদ্রা, সর্বাঙ্গাসন বা সর্বাঙ্গ সাধন মুদ্রামৎস্যাসন ইত্যাদি কিছুদিন অভ্যাস করলে অচিরে অস্বাভাবিক বীর্ষক্ষয়ের হাত থেকে পরিত্রাণ পেয়ে সুস্থদেহ ও মনে শান্তিতে জীবন কাটাতে পারবে।


কিশোর ও যুবকদের মনে যখনই কামভাব জাগবে তখনই তারা গোমুখাসন-এ উপবেশন করলে কামভাব একেবারে দূরীভূত হবে। কামোত্তেজনা দমনের সর্বাপেক্ষা সহজ ও শ্রেষ্ঠ উপায় হল—মহাবদ্ধ মুদ্ৰা অভ্যাসের পরই মহামুদ্রা অভ্যাস করা।



যখনই মনে কামভাব জাগবে, তখনই যদি কুহুনাড়ী, গুহ্যদ্বার ও তলপেট আকর্ষণ ও বিকর্ষণ ক'রে একবার মহামুদ্রা অভ্যাস করে তার পরই মহাবদ্ধ মুদ্ৰা অভ্যাস করা যায়, তাহলে কামরিপু সহজেই দমিত হয়। এ ছাড়া নিম্নে প্রদত্ত নিয়মগুলি পালন করলে সুপ্তিস্খলন অনেকটা কম হয় যথা—


১. কোষ্ঠ পরিষ্কার না হলে বা পেট গরম হলে যুবকদের সাধারণতঃ সুপ্তিস্খলন হয়। এজন্যে কোষ্ঠ যাতে দৈনিক পরিষ্কার হয়, তার দিকে সকলের দৃষ্টি রাখা উচিত।


রোজ সকালে নাস্তা হিসাবে অঙ্কুরিত ছোলা, আদা ও লবণ সহযোগে খাওয়া; দিনের বেলায় ভাতের সঙ্গে কিছু সবুজ শাক-সবজি গ্রহণ করা এবং রাত্রে ভাতের বদলে লাল আটার রুটি খাওয়া কোষ্ঠ পরিষ্কারে সহায়তা করে।


এ ছাড়া রাত্রে শোয়ার আগে এক গ্লাস ঠাণ্ডা পানি পান করে শয়ন এবং সকালে ঘুম থেকে উঠে আর এক গ্লাস পানি পান কোষ্ঠ পরিষ্কারের সহজ উপায়। এতেও যদি ফল না হয়, তাহলে রাত্রে শোয়ার আগে ২/৩ চামচ ইসবগুলের ভূমি চিনি ও ফলসহ খেয়ে শুলে এবং ভোরে উঠে ১ গ্লাস হালকা গরম পানি লবন পাতিলেবুর রসসহ পান করে অগ্নিসার অভ্যাসের পর পায়খানায় গেলে পরিষ্কার দাস্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।


এছাড়া সকালে ঘুম থেকে উঠে সহজ বস্তিক্রিয়া অভ্যাসের পর পায়খানায় গেলে সহজে দাস্ত পরিষ্কার হয়।


২. দিনের বেলায় ঘুমানো স্বপ্নদোষের আর একটি কারণ। দিনের বেলা ঘুমালে সাধারণতঃ দেহ উত্তপ্ত ও উত্তেজিত হয়। ফলে সুপ্তিস্খলন হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাছাড়া দিনের বেলা ঘুমালে রাত্রে ভাল ঘুম হতে চায় না।


রাত্রে তন্দ্রাচ্ছন্ন ঘুমের ফাঁকে কামোত্তেজক স্বপ্ন মনে জাগলে সুপ্তিস্খলন হয়। এইজন্য যুবকদের দিনের বেলায় ঘুমানো উচিত নয়। গ্রীষ্মকালে যদি রাত্রে ভাল ঘুম না হয়, তা হলে দুপুরে ৪৫ মিনিট থেকে ১ ঘন্টা ঘুমানো যেতে পারে।


কোন কারণে শেষ রাত্রে ঘুম ভেঙে গেলে আর ঘুমান উচিত নয়। উঠে মুখ হাত ধুয়ে, দাঁত মেজে, এক গ্লাস ঠান্ডা পানি পান করে মলত্যাগের পর ছাত্রদের পড়াশুনা আরম্ভ করা উচিত।


8. রাতে আহারের আগে স্নান অথবা আহারের পরে মুখ, হাত, পা বেশ ভাল করে ঠাণ্ডা জলে ধুয়ে সমস্ত দেহ ভিজে গামছা দিয়ে ভাল করে মুছে, জননেষ্ক্রিয় ও তার চার পাশ বিশেষভাবে মুত্রদ্বার ও মলদ্বার ভাল করে শীতল জলে ধৌত করে সৃষ্টিকর্তার নাম করতে করতে শান্ত মনে শয়ন করা উচিত। শয়নের পূর্বে গোমুখাসন করলে সুপ্তিস্খলন অনেকটা কম হয়।


প্রতিদিন রাতে শোয়ার আগে দিনলিপি-(ডায়েরি) লেখার অভ্যাস করতে হবে। এতে মনের পরিবর্তন সাধন সম্ভব হয়।