পূর্ব বর্ণিত সহজ প্রাণায়াম কয়েক মাস অভ্যাস করার পর লঘু প্রাণায়াম অভ্যাস করা যেতে পারে।

যোগশাস্ত্রকারদের মতে লঘু প্রাণায়াম আট প্রকার যথা—(১) সূর্যভেদ, (২) উজ্জায়ী, (৩) সীৎকারী, (৪) শীতলী, (৫) ভ্রামরী, (৬) ভস্তিকা, (৭) মূৰ্চ্ছা ও (৮) প্লাবনী।

এগুলোর মধ্যে প্রথম পাঁচটি অভ্যাসবিধি এই ওয়েবসাইটে দেওয়া হলো। বাকি তিনটি গুরুর তত্ত্বাবধানে অভ্যাস করা উচিত।

(১) সূৰ্য্যভেদ


যে কোনো ধ্যানাসন-এ বসে অনামিকা ও কনিষ্ঠাঙ্গুলি দিয়ে বাম নাক বন্ধ করুন এবং বৃদ্ধাঙ্গুলি ডান নাকের উপর আলতোভাবে রাখুন।


এখন পিঙ্গলা নাড়ী দ্বারা অর্থাৎ ডান নাক দিয়ে দিয়ে ধীরে ধীরে দম ভোরে বায়ু গ্রহণ বা

পুরক করুন।


আকর্ষিত বায়ু জালন্ধরবন্ধ মুদ্রা, উড্ডীয়ানমূলবন্ধ মুদ্রা তিনটি মুদ্রা দ্বারা ধারণ করে নিজ নিজ সাধ্যমত ১৫/২০ সেকেন্ড কুম্ভক করুন। যে পর্যন্ত না পায়ের নখ হতে মাথার চুল পর্যন্ত দেহস্থ সমস্ত নাড়ীসমূহের বায়ু রোধ হয়।


পরে বৃদ্ধাঙ্গুলি দ্বারা ডান নাক বদ্ধ করে এবং অনামিকা ও কনিষ্ঠাঙ্গুলি দিয়ে ইড়া নাড়ীর দ্বারা অর্থাৎ বাম নাক দিয়ে ধীরে ধীরে বায়ু ত্যাগ বা রেচক করুন।


বায়ু ত্যাগকালে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে যাতে পুরক-এ যত সময় লেগেছে রেচক অভ্যাসকালে যেন তার চেয়ে বেশি সময় না লাগে। অর্থাৎ ২ঃ১ঃ২ রেশিওতে হবে।


কখনও তাড়াহুড়ো করে রেচক অভ্যাস করবেন না। ঠিক এই রকমভাবে প্রাণায়ামটি নিজ নিজ সামর্থ্যমত ৫ থেকে ১০ মিনিট অভ্যাস করবেন।


চিন্তা: প্রতিবারে কুম্ভক-এর সময় চিন্তা করতে হবে—আমার ব্যাধি ও দুর্বলতা দুর হয়ে যাচ্ছে, আমার শরীর অসীম প্রাণশক্তিতে পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।


উপকারিতা


এই প্রাণায়াম অভ্যাসে স্নায়ুর দুর্বলতা দুর হওয়ায় দেহ সবল হয়। ইহা অজীর্ণ দুর করে ক্ষুধা বৃদ্ধি করে, কৃমি নাশ করে, দেহের মেদ কমায় এবং নাকের যাবতীয় ব্যাধি দূর করে শ্লেষ্মাদোষ নাশ করে।


(২) উজ্জ্বায়ী


যে কোন ধ্যানাসন-এ বসে মুখ বন্ধ রেখে গলা (ভোকাল্ কর্ড) হতে সশব্দে উভয় নাসিকা দিয়ে বায়ু গ্রহণ বা পুরক করুন। পুরক শেষে চিবুক কণ্ঠকূপে সংলগ্ন করে জালন্ধরবন্ধ অবস্থায় বস্তিপ্রদেশের স্নায়ুগুলোকে আকর্ষণ করে নিজ নিজ সামর্থ্যমত ১৫ সেকেন্ড থেকে ৩০ সেকেন্ড পর্যন্ত বায়ুধারণ বা কুম্ভক করুন।

এইবার স্নায়ুর আকর্ষণ শিথিল করে এবং বৃদ্ধাঙ্গুলি দ্বারা ডান নাক বন্ধ করে ধীরে ধীরে বাম নাক দিয়ে বায়ু ত্যাগ বা রেচক করুন।


ঠিক এইভাবে এই প্রাণায়ামটি উভয় নাকে ১০ থেকে ২০ বার অভ্যাস করুন।


চিন্তা: প্রতিবার কুম্ভক-এর সময় চিন্তা করতে হবে আমার স্বপ্নদোষা দুর হয়ে যাচ্ছে এবং আমি ঊর্ধ্বরেতা হয়ে উঠেছি।


মেয়েরা চিন্তা করবে—আমার রতিগ্রন্থির রসাদির অনিচ্ছাকৃত ক্ষরণ এবং প্রদরাদি রোগ আরোগ্য হচ্ছে এবং আমি কামজয়ী হয়ে উঠছি।


উপকারিতা


এই প্রাণায়াম অভ্যাসে কফরোগ, হাঁপানি ইত্যাদি সেরে যায়। স্ত্রী পুরুষের ধাতু ক্ষয় রোগ নিরাময় হয় এবং অকালমৃত্যু ও জরা রোধ হয়। উচ্চচাপ রোগীরা এই প্রাণায়াম-এ আশ্চর্য সুফল লাভ করবে।


(৩) সীৎকারী


যে কোন ধ্যানাসন-এ বসে অধর ও ওষ্ঠ সরু করে পরস্পর সংলগ্ন করুন। এখন জিহ্বাগ্র, অধর ও ওষ্ঠে সংলগ্ন করুন।

এইবার মুখ দিয়ে একটানা ‘সি সি সি’ শব্দ করতে করতে বেশ জোরের সঙ্গে ধীরে ধীরে মুখ দিয়ে বায়ু গ্রহণ বা পুরক করুন। এইভাবে পুরক শেষ হলে ৫/১০ সেকেন্ড কুম্ভক করে উভয় নাক দ্বারা বায়ু ত্যাগ বা রেচক করুন।

ঠিক এইভাবে নিজ সামর্থ্য মত ৫ থেকে ১০ মিনিট এই প্রাণায়াম অভ্যাস করুন।


চিন্তা: প্রতিবার কুম্ভক-এর সময় চিন্তা করতে হবে আমার নিদ্রা, আলস্য ও তমোভাব দূর হয়ে যাচ্ছে। আমার দেহমন দিব্য শক্তির অধিকারী হচ্ছে।


উপকারিতা


এই প্রাণায়াম অভ্যাসে নিদ্রা, আলস্য জড়তা ও শারীরিক দুর্বলতা দূর হয়। দেহ বলশালী ও স্বাস্থ্যদীপ্ত হয়। যোগ শাস্ত্রকারেরা বলেন, এই প্রাণায়াম অভ্যাসে দেহ শ্রীমণ্ডিত হওয়ায় পুরুষেরা কামদেব সমান রূপবান আর মেয়েরা অসামান্য রূপবতী হন।


(৪) শীতলী


অধর ও ওষ্ঠের মাঝখান দিয়ে জিহ্বাগ্রকে বার করে যে কোন ধ্যানাসন-এ বসুন। এখন অধর ওষ্ঠকে পাখির ঠোঁটের মতো করে জিহ্বাগ্র দিয়ে ধীরে ধীরে বায়ু গ্রহণ বা পুরক করুন।

পুরক শেষে আকর্ষিত বায়ু জালন্ধরবন্ধ মুদ্রা, উড্ডীয়ানমূলবন্ধ মুদ্রা তিনটি মুদ্রা দ্বারা ধারণ করে নিজ সামর্থ্যমত ১৫/২০ সেকেন্ড কুম্ভক করুন। যে পর্যন্ত না পায়ের নখ থেকে মাথার চুল পর্যন্ত দেহস্থ নাড়ীসমূহের বায়ু রোধ হয়।


এই বার উভয় নাক দিয়ে ধীরে ধীরে বায়ু ত্যাগ বা রেচক করুন। ঠিক এইরকমভাবে এই প্রাণায়াম কমপক্ষে ৫ মিনিট অভ্যাস করুন।


আমার মনে হয় রক্তচাপে আক্রান্ত রোগীরা কেবলমাত্র পুরক এবং রেচক অভ্যাস করলে খুব ভাল ফল লাভ করবেন। পুরক-এর সময় শরীরের অভ্যন্তরে ঠাণ্ডা বাতাসের প্রবেশ অনুভব করবেন। এবং সাধারণভাবে রেচক করবেন। মোটেই কুম্ভক অভ্যাস করবেন না।


উপকারিতা


যোগীরা বলেন, এই প্রাণায়াম অভ্যাসে রক্ত শুদ্ধ হয় এবং প্রাণশক্তি এত বৃদ্ধি পায় যে বিষাক্ত সাপের কামড়েও এই প্রাণায়াম অভ্যাসকারীর মৃত্যু হয় না।


পিত্তপ্রধান নরনারীর পক্ষে এই প্রাণায়াম বিশেষ উপকারী। উচ্চচাপের রোগীরা এই প্রাণায়াম-এ আশ্চর্য সুফল লাভ করবে।


(৫) ভ্রামরী


প্রণালী


বজ্রাসন-এ বসে দুহাতের আঙ্গুল (তর্জনি) দিয়ে ৭৭ নং ছবির মতো দুই কানের ছিদ্র হাল্কা করে বন্ধ করতে হবে। প্রথমে দম নিয়ে ১০ সেকেন্ড কুম্ভক করুন।


তারপর ভ্রমরের ডাকের মতো শব্দ করতে করতে রেচক করুন। পরে আবার স্বাভাবিক দম নিয়ে ১০ সেকেন্ড কুম্ভক করে ধীরে ধীরে পুনরায় ভ্রমরের ডাকের মত শব্দ করতে করতে রেচক করুন।


রেচক-এর সময় আমাদের স্বরযন্ত্র (ভোকাল্ কর্ড) যখন কাঁপবে তখন স্বরযন্ত্রের কম্পন আমাদের কানের পর্দায় (টিপ্যানিক মেনে) যেন অনুভূত হয় সেদিকে দৃষ্টি দিতে হবে।


এইভাবে পুরক, কুম্ভকরেচক অভ্যাস করলে একবার ভ্রামরী অভ্যাস করা হয়।


এই প্রাণায়াম চার দফায় অভ্যাস করতে হবে। প্রতি দফায় পাঁচবার পুরক, কুম্ভকরেচক করতে হবে।


প্রতি দফা অভ্যাসের পর ১৫ সেকেন্ড শবাসন অভ্যাস করতে হবে।

উপকারিতা


এই প্রাণায়াম অভ্যাসে শ্রবণেন্দ্রিয়ের কাজ ভাল হয়, গলার স্বর মিষ্ট হয় এবং গলায় শ্লেষ্মা জমে না।


যারা কানে কম শোনে তারা এই প্রাণায়াম অভ্যাস করলে তাদের শ্রবণেন্দ্রিয়ের উন্নতি হয়, তারা স্বাভাবিকভাবে কানে শুনতে পায়। শরীরের ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।


এই ভ্রামরী অভ্যাস করে চিত্তে অনির্বচনীয় আনন্দ অনুভব করতে পারেন অভ্যাসকারীরা।