বহুমূত্র বা ডায়াবেটিস নিরাময়ে যোগব্যায়াম
এখানে যে ব্যায়ামগুলো নিয়ে কথা বলব সেগুলো ডায়াবেটিস নিরাময় করতে সহযোগিতা করবে। ব্যায়ামগুলো করলে প্যানক্রিয়াসের কাজ ভাল হয়। ফলে প্যানক্রিয়াস থেকে প্রয়োজনমতো ইনসুলীন রস বের হয়। ফলে বহুমুত্র বা ডায়াবেটিস সেরে যায়।
ব্যায়াম সম্বন্ধে আলোচনায় যাওয়ার আগে ডায়াবেটিস রোগ এবং অন্যান্য প্রসঙ্গ নিয়ে একটু আলোচনা করা দরকার।
প্লীহা, যকৃত ও অগ্ন্যাশয় (প্যানক্রিয়াস্) যখন নিজের কাজ ঠিকমতো করতে পারে না—তখনই ডায়াবেটিস বা বহুমূত্র রোগ দেখা যায়। এই রোগ দু’রকম যথা— (১) শর্করাযুক্ত বহুমূত্র—মধুমেহ (ডায়াবেটিস্ মেলিটাস্) এবং (২) শর্করাহীন বহুমূত্র (ডায়াবেটিস ইন্সিপিডাস্)।
ইনসুলিনের অভাব হলেই গ্লুকোজ অধিক মাত্রায় লিভার থেকে বের হয়ে রক্তে মিশে রক্তের স্বাভাবিক মাত্রার (৮০ থেকে ১৪০ মিলিগ্রাম) চেয়ে বৃদ্ধি করে। ওই বর্ধিত গ্লুকোজ মূত্রের সঙ্গে চিনি আকারে বের হয়ে যায়—তখনই মধুমেহ ( ডায়াবেটিস্ মেলিটাস্ ) রোগের লক্ষণ প্রকাশ পায়।
এই রোগের লক্ষণ
রোগের প্রথম দিকে...
(১) বার বার তেষ্টা পাওয়া
(২) ঘন ঘন প্রস্রাব পাওয়া
(৩) ঘামের পরিমাণ কমে যাওয়া
(৪) মুখে প্রায় সব সময় মিষ্টি স্বাদ অনুভব করা।
এই রোগ পুরাতন হলে ...
(১) দুর্বলতাবোধ
(২) মাথাধরা
(৩) মাথা ঘোরা
(৪) কোষ্ঠকাঠিন্য
(৫) ক্ষুধা বৃদ্ধি
(৬) মুত্রাশয়ে জ্বালা।
সাধারণত দেখা যায়—পুরাতন অজীর্ণ রোগীরা ও ৫০ বছরের ঊর্ধ্বে বয়স্ক ব্যক্তিরা বহুমূত্র রোগে আক্রান্ত হন। কোনো ব্যক্তি এই রোগে আক্রান্ত হয়েছেন কীনা নিশ্চিতভাবে জানতে হলে ওই ব্যক্তির মূত্র ও রক্ত পরীক্ষা করা উচিত।
এই রোগে প্রথমে শরীরের কর্মক্ষমতা কমতে থাকে। মানুষ ক্রমান্বয়ে দুর্বল হয়ে পড়ে। দেহে বিভিন্ন কোষে গ্লুকোজ সঞ্চিত হলে প্রধান প্রধান নলবিহীন বা অন্তক্ষরা (ডাক্টলেস্ অর এনডোক্রিশ) গ্রন্থিগুলি ক্রমান্বয়ে অকেজো হয়ে পড়ে।
এমন কি হৃৎপিণ্ডের কর্মশক্তিও অকেজো হয়ে যেতে পারে। এ ছাড়া গ্লুকোজের মধ্যে রোগ-জীবাণু তাড়াতাড়ি বৃদ্ধি পাওয়ায় রোগীর দেহে কোনো রোগ জীবাণু প্রবেশ করলে ওই জীবাণুর বংশবৃদ্ধি এত দ্রুত হয় যে রোগী জীবাণুঘটিত কোনো রোগে আক্রান্ত হলে সেই রোগ সহজে সারতে চায় না।
ডায়াবেটিস রোগীর খাদ্য-পথ্য
বহুমূত্র রোগীরা প্রথম অবস্থায় দু একদিন উপবাস দিবেন। এই সময় প্রচুর পানিপান ব্যতীত কোনো খাদ্য গ্রহণ না করাই ভালো।
উপবাস বা রোজায় অক্ষম রোগী পাকা ও টক্মিষ্টিযুক্ত ফল, যথা—কমলালেবু, আনারস খেতে পারে। উপবাসে রোগীর রক্তে ও প্রস্রাবে চিনির ভাগ অনেক কমে যায়— কখনও একেবারেই থাকে না।
পুরাতন বহুমূত্র রোগী ভাত বা রুটির বদলে কাঁচকলা সিদ্ধ, মানকচু বা ওল সিদ্ধ খাবেন। রোগী অম্লধর্মী আমিষ জাতীয় খাদ্য, যথা—মাছ, মাংস, ডিম ইত্যাদি না খেয়ে ক্ষারধর্মী আমিষ জাতীয় খাদ্য, যথা— দই, ছানা, নারিকেল ইত্যাদি খাবেন।
কাঁচকলা, থোড়, মোচা, ডুমুর, টমাটো, শাক-সবজি এই রোগীর জন্য ভালো পথ্য। নিয়মিত করলার রস পান করলে রোগের প্রকোপ কমে যায়।
আবার নিম গাছের বাকল অথবা তেজপাতা ভিজানো পানি খালিপেটে পান করলে বহুমূত্র রোগীরা দ্রুত ফল লাভ করবে।
প্রথম দিন ১ গ্লাস পানিতে ১ টি তেজপাতা পরের দিন ২টি, এইভাবে ২১ দিনের দিন ২১ টি তেজপাতাসহ পানি পান করতে হবে।
পুনরায় ১টি করে কমিয়ে ২১ দিনের দিন ১টি তেজপাতা ভিজানো পানি পান করতে হয়। অর্থাৎ মোট ৪২ দিন পান করতে হবে।
একাদশী, অমাবস্যা ও পূর্ণিমায় উপবাস করা বহুমুত্ররোগীর একান্ত আবশ্যক। উপবাসের দিন অল্প আহার, ভাত না খেয়ে রুটি খাওয়া উচিত।
এলোপ্যাথিক মতে ইনস্যুলিন (ইনস্যুলিন) ইন্জেকশন এই রোগের একমাত্র ওষুধ। যদিও ইন্জেকশনে রোগ সম্পূর্ণ নিরাময় হয় না। তবে ইন্জেকশনের দরুন রক্তে ও প্রস্রাবে চিনির মাত্রা কমে যাওয়ায় রোগ লক্ষণ সাময়িকভাবে অদৃশ্য হয়।
ইন্জেক্শন বন্ধের কয়েকদিন বাদে সাধারণত রোগের লক্ষণ আবার প্রকট হয়ে ওঠে।
এই রোগ সম্পূর্ণ নিরাময় করার জন্যে প্রাচীন মুনিঋষিদের প্রবর্তিত যোগব্যায়াম অভ্যাস করা প্রয়োজন
বহুমূত্র রোগীরা পূর্বে উল্লিখিত খাদ্য তালিকা থেকে নিজ অভিরুচিমতো খাদ্য তালিকা তৈরি করে নিজ প্রস্তুত খাদ্য তালিকা থেকে খাদ্য গ্রহণের সাথে সাথে নিয়মিত ২/৩ মাস প্রদত্ত যোগব্যায়ামগুলি অভ্যাস করলে প্লীহা, যকৃত ও অগ্ন্যাশয় সুস্থ ও সক্রিয় হয়।
এর ফলে আমিষ ও শ্বেতসার জাতীয় খাদ্য থেকে চিনি বা গ্লুকোজ তৈরী করে—যকৃতে গ্লাইকোজেন রূপে সঞ্চিত করে রাখে এবং ওই গ্লাইকোজেন দৈহিক নানা প্রয়োজনে যথাসময়ে ব্যয়িত হয়। ফলে রোগী রোগমুক্ত হয়।
যোগ চিকিৎসা
এরপর গোমুখাসন, উত্থিত পদাসন, জানুশিরাসন, পশ্চিমোত্তানাসন এবং যোগমুদ্রা অভ্যাস করতে হবে।
সবশেষে ৫ মিনিট শবাসন করে যোগব্যায়াম শেষ করতে হবে।
এর বাইরে প্রতিদিন সকালে বা সন্ধ্যায় ভ্রমণ প্রাণায়াম করতে হবে।
পেটের মেদ কমায়।
ক্ষুধা বৃদ্ধি করে।
পেট হাত ও কাঁধের মাংসপেশিকে সবল ও অধিক কর্মক্ষম করে।
পাকস্থলী, যকৃৎ, পাচনতন্ত্র, মূত্রাশয় ও প্যানক্রিয়াস প্রভৃতি পুষ্ট হওয়ায় কোষ্ঠবদ্ধতা, অজীর্ণ, ডায়াবেটিস প্রভৃতি দুর হতে সাহায্য করে।
মেরুদণ্ডের নমনীয়তা বাড়ে এবং দেহের অসামঞ্জস্যতা দুর করে। বার্ধক্য আমাদের সহজে আক্রমণ করতে পারে না। যৌবন দীর্ঘস্থায়ী হয়।
রক্তাল্পতা রোগীর রোগ সেরে যায়।
এডরেনাল গ্রন্থির কাজ ভালো হয়।
কিড্নির কাজ ভালো হয়।
কোনোদিন পাইলস হবে না। হলেও সেরে যায়।
আমাশয় হয় না। হলে সেরে যায়।
দেহকে সুঠাম ও সুশ্রী করে।
পেটে চর্বি জমতে পারে না এবং জানু ও পাছার পেশীর স্থিতিস্থাপকতা বৃদ্ধি পায়।
হাঁপানি সারাতে সাহায্য করে।
মাংসপেশির কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।
শিরার মধ্যে ভালোভাবে রক্ত সঞ্চালিত হওয়ায় ক্লান্তি সহজে দুর হয়ে যায়।
উচ্চ রক্তচাপাক্রান্ত রোগীদের এই ব্যায়াম বিশেষ প্রয়োজন।
সতর্কতা
যাদের হৃদরোগ আছে বা উচ্চ রক্তচাপের রোগী যারা তাদের জন্য মাথা নিচু করে যেসব আসন করতে হয় সেগুলো করা নিষেধ।
সেক্ষেত্রে ব্যায়াম অভ্যাসকারীর জন্য (১ ) শীর্ষাসন, (২) শশাংগাসন, (৩) পদহস্তাসন, (৪) হলাসন,(৫) উড্ডীয়ান, (৬) ময়ূরাসন, (৭) বিপরীতকরণী মুদ্রা ও (৮) মৎস্যাসন অভ্যাস করা সম্পূর্ণ নিষেধ।
উপসংহার
এ যুগে মানুষের রোগের শেষ নাই। তাই নিজ নিজ সমস্যা অনুযায়ী ৫/৬টি খালি হাতে ব্যায়াম অভ্যাস করুন।
তারপর প্রয়োজন মতো ৫/৬টি আসন নির্বাচন করুন। সেই অনুযায়ী অভ্যাস করুন।
এরপর সমস্যা অনুযায়ী মুদ্রাও অভ্যাস করতে পারেন। কিছু রোগে এটি প্রয়োজনীয়।
সবশেষে প্রয়োজন হলে প্রাণায়াম নির্বাচন করে অভ্যাস করুন।
সর্বোপরি, অসুস্থদের যোগব্যায়ামের নিয়মকানুন ভালভাবে পড়ে নেবেন। সুস্থদের যোগব্যায়ামের নিয়মকানুনও জেনে রাখুন।
এছাড়া কেন যোগব্যায়াম করবেন সেটি দেখে নিন। দ্রুত ফল পাবেন।
যোগব্যায়ামকারীর খাদ্য সম্পর্কে জানুন এবং যোগব্যায়ামকারীদের অবশ্যই যে বিষয়গুলো জানা দরকার সেগুলো ভালো করে পড়ে নিন।
