অর্শ বা পাইলস নিরাময়ে যোগব্যায়াম
পরিশ্রম বিমুখতা ও পীড়িত যকৃতসহ কোষ্ঠবদ্ধতা অর্শ রোগের প্রধান কারণ। এই রোগের আরেকটি বিশেষ কারণ মানসিক দুশ্চিন্তা বা টেনশন।
যকৃত দূষিত হওয়া সত্ত্বেও যদি কোষ্ঠ তরল থাকে ও দাস্ত পরিষ্কার হয় তাহলে দূষিত যকৃত - হতে নিঃসৃত বহু বিষ তরল মলের সাথে বের হয়ে যায়—ফলে এই সব রোগীর পাইলস হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না।
মলদ্বারে বায়ু ও রক্ত চলাচলে বিঘ্নিত হলে মলনালী (রেক্টাম্) থেকে যে শিরা উপশিরা বের হয়ে মলদ্বারে এসে মেশে, সেইগুলি স্ফীত হয়ে ছোট ছোট গুটি বা ‘বলি’ সৃষ্টি করে একত্রে আঙুরের গুচ্ছের ন্যায় আকার ধারণ করে।
'বলি’ দু'রকম যথা—অন্তর্বলি ও বহিবলি। এই সব বলিতে দূষিত রক্ত এসে জমে বলেই এইগুলি চুলকায়, জ্বালা করে, বেদনাদায়ক হয়। এই ‘বলি’ ফেটে গেলে রক্ত পড়তে থাকে—একে অর্শ রোগ বলে।
প্রাচীন আয়ুর্বেদ শাস্ত্র ও আধুনিক চিকিৎসাশাস্ত্র এই রোগে অস্ত্রোপচারের ব্যবস্থা করে থাকে। এই রোগের মূল কারণ অস্ত্রোপচারে দূর হয় না।
অস্ত্রোপচারের দরুন রোগের বিষ দেহের অন্য স্থানে ছড়িয়ে পড়ে আমাশয় ও পেটের অসুখ সৃষ্টি করে এবং দেহ থেকে অন্ত্রে সঞ্চিত দূষিত মল বের করে দিয়ে দেহ-যন্ত্রকে বিষমুক্ত করতে চেষ্টা করে মাত্র। বিভিন্ন প্রলেপ প্রয়োগ বা অস্ত্রোপচারে সাময়িকভাবে রোগ চাপা দেওয়া যায় মাত্র—স্থায়ীভাবে রোগ নিরাময় সম্ভব নয়।
এই রোগ নিরাময়ের জন্য রোগীর অবশ্য করণীয় কয়েকটি পদ্ধতি নিম্নে প্রদত্ত বর্ণনা করা হলো-
১. রোগীর কোষ্ঠ যাতে পরিষ্কার থাকে, সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। রোগী সহজ বস্তিক্রিয়া অভ্যাসে সক্ষম হলে সকালে ও বিকালে সহজ বস্তিক্রিয়া অভ্যাস করবেন।
সক্ষম না হলে ত্রিফলার পানি পান করে ইসবগুলের ভূষি খেয়ে বা অন্য কোনো জোলাপ নিয়ে কোষ্ঠ পরিষ্কার রাখবেন।
২. প্রাচীনকালের মুনি ঋষিরা এই রোগে যে যোগব্যায়াম অভ্যাসের ব্যবস্থা দিয়ে গেছেন, সেইগুলি নিম্নে প্রদত্ত হল। এই ব্যায়ামগুলো দিনে অন্তত একবার অভ্যাস করতে হবে। দিনে দুইবার হলে আরও ভালো।
এসব অভ্যাসের আগে ৫/৬টি খালি হাতে ব্যায়াম অভ্যাস করতে হয়। তারপর ২/৩ মিনিট শবাসন করতে হয়।
আসনগুলো শেষ করার পরও শবাসন করতে হয় ৫ মিনিট। অর্থাৎ ৫ মিনিট শবাসন করে ব্যায়াম শেষ করতে হয়।
উল্লিখিত আসন ও মুদ্রা অভ্যাস করলে দুষিত যকৃত রোগমুক্ত হওয়ার সাথে সাথে অর্শ রোগ স্থায়ীভাবে নিরাময় হয়।
অর্শরোগী পথ্য হিসাবে কাঁচা ও পাকা পেঁপে, পটল, ওল, ডুমুর, কচু, চালকুমড়া, পুঁই, টাট্কা শাক-সবজি নিয়মিত খাবেন।
ঘি, মাখন, কাঁচকলা, থোড়, মোচা, ইচড় ইত্যাদি অর্শরোগীর পক্ষে খাওয়া ক্ষতিকর।
অন্যান্য উপকারিতা
অর্শ, ভগন্দর প্রভৃতি গুহ্যরোগ সেরে যায়।
ক্ষুধা বৃদ্ধি পায়। অজীর্ণ দুর হয়।
পেটের যাবতীয় অসুখ নিরাময় হয়।
কোষ্ঠবদ্ধতা সেরে যায়।
পেটের মেদ কমে এবং কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।
যৌন মিলনে অক্ষম ব্যক্তিদের সক্ষম হতে সাহায্য করে।
মুত্রাশয়ের দোষ দুর হয়।
প্যানক্রিয়াসের কাজ ভাল হওয়ায় প্যানক্রিয়াস থেকে প্রয়োজনমত ইনসুলীন' রস বের হয় বলে বহুমুত্র বা ডায়াবেটিস সেরে যায়।
কোমরের ব্যথা, অর্শ, কটিবাতসহ যাবতীয় বাতের ব্যাথা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।
মল সহজ ও তরল হয় এবং যকৃত, প্লীহা ও পাকস্থলীর দুর্বলতাজনিত রোগ সেরে যায়।
পেট থেকে বায়ু নিঃসরণে সহায়তা করে পেটের পেশীকে সবল করে, পেটের চর্বি কমায় এবং জানুর ও পাছার পেশীর স্থিতিস্থাপকতা বাড়ায়।
বুক ও পেটের মাঝখানকার পর্দাটির ক্রিয়া ভাল হওয়ায় হৃদযন্ত্র ও হজমযন্ত্রের কাজ ভাল হয়।
এডরেনাল গ্রন্থির কাজ ভাল হয়।
দেহের প্রাণশক্তি বৃদ্ধি করে এবং জরা, ব্যাধি ও অকালমৃত্যুর হাত থেকে দেহকে রক্ষা করে।
মাংসপেশির কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।
শিরার মধ্যে ভালভাবে রক্ত সঞ্চালিত হওয়ায় ক্লান্তি সহজে দুর হয়ে যায়।
উচ্চ রক্তচাপাক্রান্ত রোগীদের এই ব্যায়াম বিশেষ প্রয়োজন।
সতর্কতা
যাদের হৃদরোগ আছে বা উচ্চ রক্তচাপের রোগী যারা তাদের জন্য মাথা নিচু করে যেসব আসন করতে হয় সেগুলো করা নিষেধ।
সেক্ষেত্রে ব্যায়াম অভ্যাসকারীর জন্য (১ ) শীর্ষাসন, (২) শশাংগাসন, (৩) পদহস্তাসন, (৪) হলাসন, (৫) উড্ডীয়ান, (৬) ময়ূরাসন, (৭) বিপরীতকরণী মুদ্রা ও (৮) মৎস্যাসন অভ্যাস করা সম্পূর্ণ নিষেধ।
উপসংহার
এ যুগে মানুষের রোগের শেষ নাই। তাই নিজ নিজ সমস্যা অনুযায়ী ৫/৬টি খালি হাতে ব্যায়াম অভ্যাস করুন।
তারপর প্রয়োজন মতো ৫/৬টি আসন নির্বাচন করুন। সেই অনুযায়ী অভ্যাস করুন।
এরপর সমস্যা অনুযায়ী মুদ্রাও অভ্যাস করতে পারেন। কিছু রোগে এটি প্রয়োজনীয়।
সবশেষে প্রয়োজন হলে প্রাণায়াম নির্বাচন করে অভ্যাস করুন।
সর্বোপরি, অসুস্থদের যোগব্যায়ামের নিয়মকানুন ভালভাবে পড়ে নেবেন। সুস্থদের যোগব্যায়ামের নিয়মকানুনও জেনে রাখুন।
এছাড়া কেন যোগব্যায়াম করবেন সেটি দেখে নিন। দ্রুত ফল পাবেন।
এছাড়া যোগব্যায়ামকারীর খাদ্য সম্পর্কে জানুন এবং যোগব্যায়ামকারীদের অবশ্যই যে বিষয়গুলো জানা দরকার সেগুলো ভালো করে পড়ে নিন।
