আমরা যে শ্বাস গ্রহণ করি, তা শ্বাসনালীর মধ্য দিয়ে ফুসফুসে যায়। কোনো কারণে শ্বাসনালীতে শ্লেষ্মা জমলে বা স্নায়ুর দুর্বলতার জন্যে শ্বাসনালী স্বাভাবিকভাবে প্রসারিত হতে পারে না।

এজন্যই নির্দিষ্ট নিয়মে শ্বাস গ্রহণ ও ত্যাগ করা সম্ভব হয় না। শ্বাস নিতে ও ছাড়তে কষ্ট হয় এবং বুকে হাঁপ ধরে। এই অবস্থাকেই হাঁপানি বা শ্বাস রোগ বলে।

হাঁপানি রোগের সঠিক কারণ আজও আমাদের জানা নেই। ডাক্তারদের মতে এ্যালার্জি এর আরেকটি কারণ।

যোগশাস্ত্রকরেরা বলেন, ফুসফুসের স্নায়ুগ্রন্থির এবং অগ্নিগ্রন্থির দুর্বলতা হাঁপানি রোগের অন্যতম কারণ। ফুসফুস দুর্বল হলে শ্বাস-প্রশ্বাসের স্বাভাবিক উচ্ছ্বাস কম হয়।

ফলে দেহস্থ কার্বন ডাইঅক্সাইড্‌ ইত্যাদি দূষিত বায়ু দেহ থেকে ঠিকমতো নির্গত হতে না পারায় দেহে সঞ্চিত হয়ে দেহকে ব্যাধি-মন্দিরে পরিণত করে। অগ্নিগ্রন্থি দুর্বল হলে কোষ্ঠবদ্ধতা ও অজীর্ণ রোগ হয়।

ফলে দেহে বিষাক্ত দ্রব্যাদির সঞ্চারের জন্যে রক্ত দূষিত হয়। এই দূষিত রক্ত আমাদের স্নায়ুমণ্ডলীকে দুর্বল ও আংশিক অক্ষম করায় আমরা নানা রোগে আক্রান্ত হই।

হাঁপানি রোগ সাধারণতঃ ছোটবেলায় ৪/৫ বছর বয়সে হয় এবং বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সেরে যায়। কিন্তু প্রৌঢ়ত্বের শেষে অনেক সময় আবার দেখা দেয়।


এই রোগ বংশানুক্রমে পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে আমরা পেয়ে থাকি। হাঁপানি রোগে সহজে কারও মৃত্যু হয় না বটে, কিন্তু হাঁপ যখন ওঠে তখন রোগী ভীষণ কষ্ট পায়।


এই রোগ সাধারণত শেষ রাতে রোগীর ঘুম ভাঙার সাথে প্রবল হয়ে ওঠে। ক্ষুধামান্দ্য, অজীর্ণ ও অবসাদ হাঁপানির পূর্ব লক্ষণ।


১৯৭৪ সালে নভেম্বর মাসে নয়াদিল্লীতে যে হাঁপানি ও ব্রংকাইটিস রোগ সম্পর্কিত বিশ্ব সম্মেলন হয়, সেই সম্মেলনে ডাঃ ভোলে যোগদানকারী প্রতিনিধিদের সামনে কয়েকটি যৌগিক আসন দেখান ও বলেন, “বোম্বাইয়ের কাছে লোনাভালায় আমাদের যোগব্যায়াম কেন্দ্রে আমি ৮ বছর বয়স থেকে ৫৫ বছর বয়সের বহু হাঁপানি রোগীকে যোগব্যায়ামের সাহায্যে রোগমুক্ত করেছি।”


ডাঃ ভোলে আরও বলেন, “শবাসন, যোগমুদ্রা, অর্ধকূর্মাসন, হলাসন, ধনুরাসন সর্বাঙ্গাসন অভ্যাসে হাঁপানি রোগ সেরে যায়।”


হাঁপানি রোগীর খাদ্য ও পথ্য


হাঁপানির টান যে দিন উঠবে, সেদিন উপবাস দিতে হবে। উপবাসের সময় কেবল লেবু মিশ্রিত হালকা গরম পানি পান করবেন।


এই সময় ২/৪ চামচ গ্লুকোজ পানিতে গুলিয়ে পান করলে ভালো হয়। যদি ১ দিনের উপবাসে হাঁপের টান না কমে, তবে দ্বিতীয় দিনেও উপবাস করা প্রয়োজন।


তৃতীয় দিনে হাঁপের টান সম্পূর্ণ কমে না গেলে ওইদিনও অর্ধ উপবাস অর্থাৎ দিনে তরকারির ঝোল, ২৫০ গ্রাম দুধ ও ফল খাবেন এবং রাত্রে কেবল ২৫০ গ্রাম দুধ পান করবেন।


এইভাবে ২/৩ দিন অর্ধ উপবাস দিলে হাঁপের টান অনেকটা কমে যায়। বলা বাহুল্য—এই সময় রোগীর বিশ্রাম নেওয়া উচিত।


উপবাসের পর সতর্কতার সঙ্গে আহার করতে হয়। প্রয়োজন মতো দিনে ৩/৪ বারে অল্প অল্প আহার করা উচিত। ভরপেট খাওয়া এই অবস্থায় অস্বাস্থ্যকর।


রাত ৮টা থেকে রাত ১টার মধ্যে এমন লঘু আহার করতে হয়, যাতে তার পরদিন সকালে খুব জোর ক্ষুধার উদ্রেক হয়।


হাঁপানি রোগীর খাদ্যে প্রচুর শাকসবজি, ফল, মধু ও দুধ থাকা প্রয়োজন। তেল, ঘি, মাখন, ডিম, মাংস, তেলযুক্ত মাছ, মশলা ইত্যাদি এই রোগে ক্ষতিকর।


হাঁপানি রোগী নিরামিষভোজী হলে ভালো হয়। তবে যদি একেবারে আমিষ ত্যাগ করা তার পক্ষে সম্ভব না হয়, তাহলে টাটকা ছোট মাছের ঝোল খাওয়া যেতে পারে।


হাঁপানি রোগী রোজ সকালে ও সন্ধ্যায় ১ চামচ করে মধু এবং চ্যবনপ্রাশ সেবন করবেন। রোগীর সমস্ত দিনে অর্ধ লিটার থেকে ১ লিটার দুধপান স্বাস্থ্যকর। এই রোগে ধূমপান একেবারে বর্জনীয়।


যোগ চিকিৎসা


হাঁপানি রোগীর দৌড়াদৌড়ি লাফালাফি ও খেলাধূলা স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর। রোগীর কোষ্ঠবদ্ধতা থাকলে রাতে খাওয়ার পর শোয়ার আগে ৩/৪ চামচ ইসবগুলের ভূষি পানিতে বা দুধে গুলে খেয়ে শয়ন করবেন এবং পরদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে লেবু মিশ্রিত এক গ্লাস গরম পানি পান করে শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী ভ্রমণ প্রাণায়াম , উড্ডীয়ান বা অগ্নিসার অভ্যাস করে পায়খানায় গেলে কোষ্ঠ পরিষ্কার হবে।


হাঁপানি রোগী প্রথম ও দ্বিতীয় সপ্তাহে প্রাতঃকৃত্য সমাপন করে মুক্তস্থানে স্বাভাবিকভাবে দম নিতে নিতে ও ছাড়তে ছাড়তে বেড়াবেন এবং বিকালেও বেড়াবেন।


তৃতীয় সপ্তাহে হাঁপানি রোগী ভোরে ঘুম থেকে উঠে মলত্যাগ করে মুক্তস্থানে পবন মুক্তাসন, অর্ধশলভাসন, ভুজংগাসন, বিপরীতকরণী বা সর্বাঙ্গাসনউড্ডীয়ান অভ্যাস করবেন।


১ মাস পরে উপরি-উক্ত আসন ও মুদ্রাগুলোর সাথে যোগমুদ্রা, অর্ধকূর্মাসন, ধনুরাসনমৎস্যাসন অভ্যাস করবেন।


আসন ও মুদ্রাগুলো প্রথম প্রথম ১৫ সেকেন্ড অভ্যাসের পর ১৫ সেকেন্ড শবাসন অভ্যাস করবেন।


এইভাবে প্রতি আসন ও শবাসন ৪ বার অভ্যাস করবে।


আসন শুরুর আগে খালি হাতে ব্যায়াম করবেন ৫/৬টি। ওয়ার্মআপের জন্য।


সব ব্যায়াম শেষ করার ৫ মিনিট শবাসন করবেন। 


সতর্কতা


যাদের হৃদরোগ আছে বা উচ্চ রক্তচাপের রোগী যারা তাদের জন্য মাথা নিচু করে যেসব আসন করতে হয় সেগুলো করা নিষেধ।


সেক্ষেত্রে ব্যায়াম অভ্যাসকারীর জন্য (১) শীর্ষাসন, (২) শশাংগাসন, (৩) পদহস্তাসন, (৪) হলাসন, (৫) উড্ডীয়ান, (৬) ময়ূরাসন, (৭) বিপরীতকরণী মুদ্রা ও (৮) মৎস্যাসন অভ্যাস করা সম্পূর্ণ নিষেধ।


অন্যান্য উপকারিতা


বৃদ্ধিপ্রাপ্ত প্লীহা ও রুগ্ন যকৃতকে সুস্থ-সবল করে।


পুরাতন কোষ্ঠবদ্ধতা দুর করতে সহায়তা করে। 

বস্তিপ্রদেশের গ্রন্থি ও স্নায়ুগুলিকে সুস্থ সবল রাখতে বিশেষ সাহায্য করে। 

পেটে চর্বি জমতে পারে না এবং জানু ও পাছার পেশীর স্থিতিস্থাপকতা বৃদ্ধি পায়। 

হাঁপানি সারাতে সাহায্য করে।

পেটের অসুখ সারে এবং ক্ষুধা বৃদ্ধি পায়।


আমাশয়ে উপকার হয়


মেরুদণ্ড ও থাইরয়েড্‌কে সবল ও কর্মক্ষম করে।


সন্তান প্রসবের পর অযথা শিথিল হওয়া পেটের পেশীর শিথিলতা দুর হয়।


পেট ফাঁপা, অগ্নিমান্দ্য ও বহুমূত্র বা ডায়াবেটিসে উপকার হয়।


বুকের বেষ্টনী ও পাঁজরের হাড় বাড়াতে সাহায্য করে।


থাইরয়েডকে সঞ্জীবিত করে এবং স্নায়ুমণ্ডলী শক্তিশালী হয়।


যৌবন দীর্ঘস্থায়ী হয়।


ঘাড়ের কঠিনতা ও আড়ষ্টভাব দুর হয়।


বুকের খাঁচা বড় করে।


শ্বাসনালী মোটা করে ফুসফুসের শক্তি বৃদ্ধি করে।


হাঁপানি সারাতে সাহায্য করে।


ফুসফুস ও হৃদযন্ত্র অধিক কর্মক্ষম এবং রক্ত অধিকতর পরিশোধিত হয়।


হারানো স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধার হয়।


কোষ্ঠবদ্ধতা, অজীর্ণতা ও যকৃতের পীড়া দ্রুত নিরাময় হয়। পাকস্থলী, ক্ষুদ্রান্ত্র ও বৃহদন্ত্র ইত্যাদি পরিপাক যন্ত্র সবল থাকে।


কোষ্ঠবদ্ধতা, আমাশয়, অন্ত্রক্ষত, অর্শ, ভগন্দর, অ্যাপেন্ডিসাইটিস প্রভৃতি হয় না।


যৌন মিলনের ধারণ-শক্তি বৃদ্ধি পায়।


হৃদযন্ত্র ও হজমযন্ত্রের কাজ ভালো হয়।


কোমরের ব্যথা, সায়টিকার ব্যথা ও কটিবাত ইত্যাদি সেরে যায়।


মেয়েদের অনেকদিনের ঋতুকালীন মাজা ব্যথা আরোগ্য হয়।


এডরেনাল গ্রন্থির কাজ ভাল হয়।


মেয়েদের ঋতু রোগ ও শ্বেত প্রদরসহ স্ত্রীরোগ আরোগ্য হয়।


মাংসপেশির কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। 


শিরার মধ্যে ভালোভাবে রক্ত সঞ্চালিত হওয়ায় ক্লান্তি সহজে দুর হয়ে যায়।


সতর্কতা


যাদের হৃদরোগ আছে বা উচ্চ রক্তচাপের রোগী যারা তাদের জন্য মাথা নিচু করে যেসব আসন করতে হয় সেগুলো করা নিষেধ।


সেক্ষেত্রে ব্যায়াম অভ্যাসকারীর জন্য (১ ) শীর্ষাসন, (২) শশাংগাসন, (৩) পদহস্তাসন, (৪) হলাসন,(৫) উড্ডীয়ান, (৬) ময়ূরাসন, (৭) বিপরীতকরণী মুদ্রা ও (৮) মৎস্যাসন অভ্যাস করা সম্পূর্ণ নিষেধ।


উপসংহার

 

এ যুগে মানুষের রোগের শেষ নাই। তাই নিজ নিজ সমস্যা অনুযায়ী ৫/৬টি খালি হাতে ব্যায়াম অভ্যাস করুন। 

 

তারপর প্রয়োজন মতো ৫/৬টি আসন নির্বাচন করুন। সেই অনুযায়ী অভ্যাস করুন। 

 

এরপর সমস্যা অনুযায়ী মুদ্রাও অভ্যাস করতে পারেন। কিছু রোগে এটি প্রয়োজনীয়।

  

সবশেষে প্রয়োজন হলে প্রাণায়াম নির্বাচন করে অভ্যাস করুন।  

 

সর্বোপরি, অসুস্থদের যোগব্যায়ামের নিয়মকানুন ভালভাবে পড়ে নেবেন। সুস্থদের যোগব্যায়ামের নিয়মকানুনও  জেনে রাখুন। 

 

এছাড়া কেন যোগব্যায়াম করবেন সেটি দেখে নিন। দ্রুত ফল পাবেন। 

 

যোগব্যায়ামকারীর খাদ্য সম্পর্কে জানুন এবং যোগব্যায়ামকারীদের অবশ্যই যে বিষয়গুলো জানা দরকার সেগুলো ভালো করে পড়ে নিন।