স্নায়ুগুলো দেখতে সুক্ষ্ম, রজ্জু বা সূত্রের মত, পীতাভ, কোনো কোনোটি শুভ্র, উজ্জ্বল ও কোমল। এগুলো আমাদের দেহ-রাজ্যে টেলিগ্রাফের তারবিশেষ। সংবাদ বহন করাই এদের প্রধান কাজ।



মস্তিষ্ক ও সুষুম্নাকাল্ড (স্পাইন্যাল্ কর্ড) থেকে স্নায়ুগুচ্ছ নির্গত হয়েছে, সেইগুলো শরীরের অন্যান্য অসংখ্য স্নায়ুর মূলকেন্দ্র। আয়ুর্বেদ শাস্ত্রমতে স্নায়ু, শিরা ও ধমনীর আরেক নাম নাড়ী। এগুলো পেশীকে সঙ্কুচিত ও প্রসারিত করে দেহযন্ত্রকে চালিত করে।


ক্ষুধা, তৃষ্ণা, কাম, ক্রোধ, জ্বালা-যন্ত্রণা প্রভৃতি সকল প্রকার বৃত্তি ও প্রবৃত্তি এবং সকল প্রকার শারীরিক অনুভূতির মূলে আছে স্নায়বিক সঞ্চালন। আমাদের দৈহিক সুস্থতা নির্ভর করে সুস্থ স্নায়বিক সঙ্কোচন ও প্রসারণের উপর।


এই কাজে স্নায়ুগুলোকে সারাদিন কর্মব্যস্ত থাকতে হয়। রাতে ঘুমানোর সময় স্নায়ুগুলো বিশ্রামের সুযোগ পাওয়ায় ক্লান্তিমুক্ত হয়ে সজীবতা ফিরে পায় এবং নিজ দায়িত্ব পালনে আত্মনিয়োগ করে।


যদি কোনো কারণে অনেকদিন ধরে রাতে ভালো ঘুম না হয় তাহলে স্নায়ুগুলো বিশ্রামের অভাবে দুর্বল ও অবসন্ন হয়ে পড়ে।


এছাড়া নিম্নলিখিত বিভিন্ন রোগ স্নায়ুবিক দুর্বলতার কারণ হতে পারে, যথা—


(১) অজীর্ণ, (২) অম্ল, (৩) রক্তাল্পতা, (৪) কোষ্ঠবদ্ধতা, (৫) কৈশোরে অনিচ্ছায় বা ইচ্ছায় অতিরিক্ত বীর্যস্খলন, (৬) বিবাহিত জীবনে অতিরিক্ত অসংযমী ও (৭) উপদংশ বা সিফিলিস প্রভৃতি।


স্নায়বিক দুর্বলতাজনিত রোগ হতে মুক্ত হতে হলে উপরোক্ত কারণগুলোর মধ্যে যে কারণে এই রোগ সৃষ্টি হয়েছে, সেই কারণ যাতে দ্রুত দুর হয়, তার ব্যবস্থা করতে হবে।


এই ‍ওয়েবসাইটে প্রদত্ত প্রয়োজনমতো ব্যায়াম ও আসনগুলোর অভ্যাস ও নির্দিষ্ট খাদ্য গ্রহণের সাথে সাথে প্রদত্ত নির্দেশমতো চললে স্নায়বিক দুর্বলতা সহজে দুর হয়। স্নায়বিক দুর্বলতা দুর করতে মনের শক্তি বিশেষ প্রয়োজন।


পাকস্থলী ও অন্ত্রের ক্ষত, সময়মতো বা পরিমাণ মতো খাদ্য গ্রহণ না করা বা সময়-অসময়ে কু-খাদ্য গ্রহণ করলে এই রোগ দেখা যায়।


দীর্ঘদিন কোষ্ঠবদ্ধতা, অজীর্ণ বা অম্লরোগে ভোগার দরুন রোগীর দেহে ক্ষার জাতীয় রসের মাত্রা কমে যায়। ফলে অম্লরস বৃদ্ধিপ্রাপ্ত পাকস্থলীতে সঞ্চিত হয়ে পাকস্থলীতে যে ক্ষত সৃষ্টি করে, তাকে পাকস্থলী ক্ষত – গ্যাস্ট্রিক আলসার বলে।


এই রোগী খাবারের একটু পরেই পেটে ব্যথা অনুভব করে। রোগ একটু অধিক বৃদ্ধি হলেই ব্যথা বৃদ্ধির সাথে সাথে বমি হয়। বমির সাথে সাথে কোনো কোনো সময়ে রক্ত পড়ে। এই রোগকে হিমাটেমাসিস্ বলে।


বমি করার পর রোগী অল্প আরাম বোধ করে। এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির দেহের ওজন দ্রুত হ্রাস পায়। আর অজীর্ণ অম্লরস নাভির একটু উপরে অন্ত্রের দক্ষিণ দিকে সঞ্চিত হয়ে অন্ত্রে যে ক্ষত সৃষ্টি করে তাকে অদ্ভুক্ষত (ডিওডিনাল আলসার) বলে।


এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি খাবারের ২/৩ ঘন্টা পরে অন্ত্রে ব্যাথা অনুভব করে। এই রোগে রোগীর দৈহিক তেমন কোনো পরিবর্তন হয় না।


শারীরিক পরিশ্রম যারা কম করেন বা করেন না তাদের আমিষ জাতীয় উপাদানের ততো প্রয়োজন হয় না। স্বল্প পরিশ্রমী ব্যক্তি যতটা আমিষ জাতীয় খাবার খান তার সামান্য অংশ জীর্ণ হয়ে অম্লরস সৃষ্টি করে আর বাকিটা অম্লবিষে পরিণত হয়।


পিত্তের পাচক রসও জীর্ণ না হলে অম্ল বিষ সৃষ্টি করে। দেহস্থ ক্ষার ও লবণ জাতীয় রস উপরি উক্ত উপায়ে সৃষ্ট অম্লবিষকে নষ্ট করতে না পারায় দেহস্থ সঞ্চিত অম্লবিষ পাকস্থলীতে বা অন্ত্রে ক্ষত সৃষ্টি করে।


যোগ চিকিৎসা

ভোৱে সহজ বস্তিক্রিয়া অভ্যাসের পর প্রাতঃকৃত্য সমাপন করে পদহস্তাসন, অর্ধচন্দ্রাসন, যোগমুদ্রাঅগ্নিসার অভ্যাসের পর মুক্তস্থানে সহজ ভ্রমণ প্রাণায়াম অভ্যাস করবেন।


বিকালে মুক্তস্থানে ১৫ মিনিট থেকে আধঘন্টা ভ্রমণ প্রাণায়াম অভ্যাসের পর উপরোক্ত আসনগুলি অল্পমাত্রায় অভ্যাস করলে দ্রুত রোগমুক্তির সম্ভাবনা থাকে।


রোগের প্রকোপ বৃদ্ধির সময় উড্ডীয়ান, ময়ূরাসন, পশ্চিমোত্তানাসনযোগমুদ্রা অভ্যাস করা উচিত নয়।


রোগের প্রকোপ কিছু কমলে রোগী বিকালে এই ওয়েবসাইটে প্রদত্ত খালি হাতে ব্যায়াম থেকে ৫/৬টি ব্যায়াম অভ্যাসের পর পশ্চিমোত্তানাসন, হলাসন, পবন মুক্তাসন, অর্ধচন্দ্রাসন, পদহস্তাসন, সর্বাঙ্গাসন বা সর্বাঙ্গ সাধন মুদ্রামৎস্যাসন অভ্যাস করবেন।


খালি হাতে ব্যায়াম করার পর ২/৩ মিনিট শবাসন করে আসনগুলো অভ্যাস করতে হবে। আসন শেষ হলে আবার ৫ মিনিট শবাসন করতে হবে।


খাদ্য ও পথ্য


রোগের প্রকোপ যতদিন অধিক থাকে ততদিন রোগীর ধূমপান ও চা পান করা উচিত নয়। রোগীর মলের রং যতদিন কালো থাকবে বা আহারের পর রোগী পেট বা অন্ত্রে অসহ্য বেদনা অনুভব করবে, ততদিন রোগী কোনো কঠিন খাদ্য বিশেষ করে আমিষজাতীয় ও চর্বিজাতীয় খাদ্য গ্রহণ করবেন না।


ততদিন তরল খাদ্য যেমন পানি মিশ্রিত পাতলা দুধ, মিষ্টি কমলালেবুর রস, টমাটোর রস, তরিতরকারির ঝোল ও ডাবের পানি গ্রহণ করবেন। তাও একবারে অধিকমাত্রায় নয়। অল্প মাত্রায় দেড়-দু ঘন্টা অন্তর।


১০/১৫ দিন এইভাবে খাদ্য গ্রহণের পর যখন রোগীর বমির ভাব, পাকস্থলী বা অন্ত্রের বেদনা কমে যাবে, তখন রোগী আলু পটল, বেগুন, কাঁচা পেঁপে, ঝিঙে, লাউ ইত্যাদি সুসিদ্ধ মশলাবিহীন পুরাতন চালের ভাত খেতে পারে তাও অল্প মাত্রায়।


এই সময় খাদ্যের সঙ্গে সঙ্গে অল্প মাত্রায় খাঁটি ঘি, মাখন বা জলপাইয়ের তেল গ্রহণ—–পাকস্থলী ও অন্ত্রের ক্ষত দ্রুত শুষ্ক হতে সাহায্য করে।


অন্যান্য উপকারিতা


পাকস্থলী, যকৃৎ, পাচনতন্ত্র, মূত্রাশয় ও প্যানক্রিয়াস প্রভৃতি পুষ্ট হওয়ায় কোষ্ঠবদ্ধতা, অজীর্ণ, ডায়াবেটিস প্রভৃতি দুর হতে সাহায্য করে এবং ক্ষুধা বৃদ্ধি পায়।


মেরুদণ্ডের নমনীয়তা বাড়ে এবং দেহের অসামঞ্জস্যতা দুর হয়।


রক্তাল্পতার রোগীদের জন্য উপকারী।


যৌবন দীর্ঘস্থায়ী হয়।


এডরেনাল গ্রন্থির ও কিডনির কাজ ভালো হয়।


বস্তিপ্রদেশের গ্রন্থি ও স্নায়ুগুলিকে সুস্থ সবল রাখতে বিশেষ সাহায্য করে। 


পেটে চর্বি জমতে পারে না এবং জানু ও পাছার পেশীর স্থিতিস্থাপকতা বৃদ্ধি পায়। 


হাঁপানি সারাতে সাহায্য করে।


ক্ষুধা বৃদ্ধি পায়। অজীর্ণ দুর হয়। পেটের যাবতীয় পীড়া নিরাময়ে সহায়তা করে। 

যৌন মিলনে অক্ষম ব্যক্তিদের সক্ষম হতে সাহায্য করে।

ফুসফুস ও হৃদযন্ত্র অধিক কর্মক্ষম এবং রক্ত অধিকতর পরিশোধিত হয়।

হারানো স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধার করা সহজ হয়।


সায়টিকা, অর্শ, আমাশয় নিরাময়ে বিশেষ কার্যকর। 


পেট ও বস্তি প্রদেশের সঞ্চিত চর্বি কমিয়ে দেহকে সুঠাম ও সুশ্রী করে।

থাইরয়েড্‌ গ্রন্থিকে সবল ও কর্মক্ষম করে।

তলপেটের ও কোমরের মাংসপেশিগুলো সবল হওয়ায় ওই জায়গার স্থূলতা কমে।

সন্তান প্রসবের পর অযথা শিথিল হওয়া পেটের পেশীর শিথিলতা দুর হয়।


কোষ্ঠবদ্ধতা, পেট ফাঁপা, অগ্নিমান্দ্য সারাতে অদ্বিতীয়।


যকৃত, প্লীহা ও পাকস্থলীর দুর্বলতাজনিত রোগ সেরে যায়।


থাইরয়েড ও স্নায়ুমণ্ডলী শক্তিশালী হয়।


যৌবনকে দীর্ঘস্থায়ী হতে সাহায্য করে।


যাদের প্লীহা বড় হয়েছে, যাদের হাঁপানি আছে, তাদের এই ব্যায়াম বিশেষ উপকারী।


স্বপ্নদোষ ও শুক্রহীনতা প্রভৃতি নিরাময় হয়। স্ত্রী-পুরুষদের যৌনগ্রন্থি সঞ্জীবিত হয়।


পুরুষের অণ্ডকোষ ও নারীদের গর্ভাশয়ের দুর্বলতা সহজে আরোগ্য হয়।


বুকের খাঁচা বড় করে।


শ্বাসনালী মোটা করে ফুসফুসের শক্তি বৃদ্ধি করে।


মাংসপেশির কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। 


শিরার মধ্যে ভালভাবে রক্ত সঞ্চালিত হওয়ায় ক্লান্তি সহজে দুর হয়ে যায়।



সতর্কতা


যাদের হৃদরোগ আছে বা উচ্চ রক্তচাপের রোগী যারা তাদের জন্য মাথা নিচু করে যেসব আসন করতে হয় সেগুলো করা নিষেধ।


সেক্ষেত্রে ব্যায়াম অভ্যাসকারীর জন্য (১ ) শীর্ষাসন, (২) শশাংগাসন, (৩) পদহস্তাসন, (৪) হলাসন,(৫) উড্ডীয়ান, (৬) ময়ূরাসন, (৭) বিপরীতকরণী মুদ্রা ও (৮) মৎস্যাসন অভ্যাস করা সম্পূর্ণ নিষেধ।


উপসংহার

 

এ যুগে মানুষের রোগের শেষ নাই। তাই নিজ নিজ সমস্যা অনুযায়ী ৫/৬টি খালি হাতে ব্যায়াম অভ্যাস করুন। 

 

তারপর প্রয়োজন মতো ৫/৬টি আসন নির্বাচন করুন। সেই অনুযায়ী অভ্যাস করুন। 

 

এরপর সমস্যা অনুযায়ী মুদ্রাও অভ্যাস করতে পারেন। কিছু রোগে এটি প্রয়োজনীয়।

  

সবশেষে প্রয়োজন হলে প্রাণায়াম নির্বাচন করে অভ্যাস করুন।  

 

সর্বোপরি, অসুস্থদের যোগব্যায়ামের নিয়মকানুন ভালভাবে পড়ে নেবেন। সুস্থদের যোগব্যায়ামের নিয়মকানুনও  জেনে রাখুন। 

 

এছাড়া কেন যোগব্যায়াম করবেন সেটি দেখে নিন। দ্রুত ফল পাবেন। 

 

যোগব্যায়ামকারীর খাদ্য সম্পর্কে জানুন এবং যোগব্যায়ামকারীদের অবশ্যই যে বিষয়গুলো জানা দরকার সেগুলো ভালো করে পড়ে নিন।